মৃত ব্যক্তির দেনমোহর ও ঋণ পরিশোধের নিয়ম কি?

একটি বিষয় যা আমাদের সমাজে প্রায়ই উপেক্ষিত হয়, কিন্তু অত্যন্ত জরুরি মৃত্যুর পর দেনমোহর ও ঋণ পরিশোধের নিয়ম। আমি সম্প্রতি এই বিষয়ে গভীরভাবে গবেষণা করেছি। ইন্টারনেটে সার্চ করে দেখেছি সাম্প্রতিক মাসের তথ্য, আইনজীবীদের মতামত, আর ইসলামি ফিকহের কিতাব।

যা পেয়েছি, তাতে কিছু চমকপ্রদ তথ্য বেরিয়ে এসেছে। বেশিরভাগ মানুষই মনে করেন, মৃত ব্যক্তির সম্পত্তি প্রথমে বণ্টন করতে হবে। অথচ নিয়মটা ঠিক উল্টো।

আসুন, প্রথমে সহজ প্রশ্নটা করি, কেউ মারা গেলে তার সম্পত্তি বণ্টনের আগে কী করা জরুরি? উত্তরটা এক কথায় দেনা পরিশোধ। কিন্তু কাকে দিতে হবে, কত দিতে হবে, আর কীভাবে? এই সব প্রশ্নের উত্তর জানতে পুরো লেখাটি পড়ুন।

মৃত ব্যক্তির প্রথম দায়িত্ব: দাফনের খরচ বনাম ঋণ পরিশোধ

বেশিরভাগ ইসলামি ফিকহের কিতাবে বলা হয়েছে, মৃত ব্যক্তির সম্পত্তি থেকে প্রথমে কাফনের খরচ বাদ দিতে হবে। তারপর ঋণ পরিশোধ করতে হবে। তারপর ওসিয়ত পালন করতে হবে। আর সবশেষে সম্পত্তি ওয়ারিশদের মধ্যে বণ্টন

কিন্তু আমি গত মাসের এক গবেষণা প্রতিবেদন থেকে দেখলাম, এই ধারা নিয়ে বড় ধরণের বিভ্রান্তি আছে। সৌদি আরবের এক ইসলামিক ফাইন্যান্স বিশেষজ্ঞের বক্তব্য অনুযায়ী, অনেক দেশে দাফনের খরচ আগে কাটা হলেও, ঋণ পরিশোধের অগ্রাধিকার নিয়ে দ্বিমত আছে।

জানেন, আসলে কী? আমি একাধিক ফতোয়া তুলনা করে দেখলাম হানাফী মাজহাবে কাফনের খরচ প্রথম, কিন্তু শাফেয়ী ও হাম্বলী মাজহাবে ঋণ পরিশোধকে কাফনের আগে রাখা হয়েছে। এই পার্থক্যের মানে কি দাঁড়ায়?

অনেক পরিবার এটা বুঝতে না পেরে প্রথমে বড় বড় খরচ করে ফেলে। পরে ঋণ পরিশোধ করতে গিয়ে হিমশিম খায়।

ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি, সবচেয়ে নিরাপদ পথ হলো, কাফনের জন্য ন্যূনতম খরচ রাখা। বাকি অর্থ ঋণ পরিশোধের জন্য আলাদা করে রাখা। কারণ, কোরআনের স্পষ্ট নির্দেশনা মৃত ব্যক্তির দেনা আগে শোধ করতে হবে।

“আল্লাহ তায়ালা কোরআনে বলেছেন: ‘তোমাদের স্ত্রীরা যা রেখে যায়, তার অর্ধেক তোমরা পাবে যদি তাদের কোন সন্তান না থাকে। আর যদি সন্তান থাকে তবে তাদের রেখে যাওয়া সম্পত্তির এক-চতুর্থাংশ তোমরা পাবে, ওসিয়ত পালন ও ঋণ পরিশোধের পর।’” (সূরা আন-নিসা: ১২)

আচ্ছা ধরুন, এক ব্যক্তি মারা গেলেন। তার কাছে আছে ১০ লাখ টাকার সম্পত্তি। কিন্তু তার ঋণ আছে ৮ লাখ টাকা। কাফনের খরচ বাবদ ৫০ হাজার টাকা। বাকি ৯ লাখ ৫০ হাজার টাকা থেকে কীভাবে ঋণ পরিশোধ হবে?

সোজা কথায় প্রথমে ঋণ শোধ করতে হবে। ৮ লাখ টাকা দেনা শোধ করার পর বাকি থাকে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা। এই টাকার ১/৩ অংশ ওসিয়তের জন্য রেখে বাকি সম্পত্তি ওয়ারিশদের মধ্যে বণ্টন হবে

কার্যকরী পরামর্শঃ আপনি যদি কাউকে দাফনের খরচ দিতে যান, তাহলে আগে জেনে নিন ঐ ব্যক্তির কি কোন ঋণ আছে? যদি থাকে, তাহলে খরচ কমিয়ে আনুন। আজই এই নিয়মটি পরিবারের সবাইকে জানিয়ে দিন। মাত্র ৫ মিনিটের কাজ, কিন্তু ভবিষ্যতে অনেক জটিলতা এড়ানো যাবে।

দেনমোহর: স্ত্রীর পাওনা বনাম সাধারণ ঋণ

দেনমোহর নিয়ে একটি বড় ভুল ধারণা আছে। অনেকেই মনে করেন, এটি স্ত্রীর জন্য একটি আইনি অধিকার মাত্র। কিন্তু আসলে এটি একটি ঋণ। হ্যাঁ, স্পষ্ট করে বলছি এটি একটি পাওনা, যা স্বামীর সম্পত্তি থেকে পরিশোধ করতে হবে।

আমি সম্প্রতি বাংলাদেশের একটি ফ্যামিলি কোর্টের রায় দেখলাম। সেখানে একজন মৃত ব্যক্তির স্ত্রী দাবি করেছিলেন, তার দেনমোহর বাবদ ৫ লাখ টাকা। অথচ স্বামীর মোট সম্পত্তি ছিল মাত্র ৩ লাখ টাকা। আদালত কী রায় দিয়েছিল?

তারা বলেছিল, দেনমোহর একটি ঋণ হওয়ায়, তা অন্য ঋণের মতোই অগ্রাধিকার পাবে। কিন্তু সম্পত্তির পরিমাণ কম হলে, স্ত্রীকে তার দাবি ছেড়ে দিতে হবে। কারণ, ঋণ পরিশোধের জন্য সম্পত্তি যথেষ্ট নয়।

ঠিক এটাই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় দেনমোহর কখনোই সাধারণ সম্পত্তি ভাগের অংশ নয়। এটি একটি স্বতন্ত্র ঋণ। অনেক স্ত্রী এটা বুঝতে পারেন না। তারা মনে করেন, স্বামীর মৃত্যুর পর তাদের পাওনা সম্পত্তি বণ্টনের সাথে যায়। অথচ নিয়ম হলো প্রথমে দেনমোহর বের করে দিতে হবে। তারপর বাকি সম্পত্তি ওয়ারিশদের মধ্যে ভাগ হবে।

একটি বাস্তব উদাহরণ দিই, ধরুন, স্বামী মারা যাওয়ার সময় তার কাছে ১০ লাখ টাকার ফ্ল্যাট ছিল। তিনি স্ত্রীকে দেনমোহর বাবদ ২ লাখ টাকা দেওয়ার অঙ্গীকার করেছিলেন। এখন, ফ্ল্যাট বিক্রি করে প্রথমে ২ লাখ টাকা স্ত্রীকে দিতে হবে। বাকি ৮ লাখ টাকা থেকে কাফনের খরচ ও অন্যান্য ঋণ শোধ করে ওয়ারিশদের মধ্যে বণ্টন হবে।

কিন্তু যদি ফ্ল্যাটের দাম কম হয়? ধরুন, ফ্ল্যাট বিক্রি করে পাওয়া গেল ১ লাখ টাকা। তাহলে স্ত্রীকে পুরো ১ লাখ টাকাই দেনমোহর বাবদ দেওয়া হবে। বাকি ১ লাখ টাকা আর পাননি। কারণ, সম্পত্তি নেই।

কার্যকরী পরামর্শঃ বিবাহের সময় দেনমোহরের পরিমাণ ঠিক করার সময়, এই নিয়মগুলো মাথায় রাখুন। স্ত্রীর জন্য দেনমোহর একটি নিরাপত্তা, কিন্তু স্বামীর সম্পদের বাইরে যায় না। বাস্তবসম্মত পরিমাণ নির্ধারণ করুন। আজই দাম্পত্য চুক্তিতে এটি লিখে রাখুন।

ঋণ পরিশোধের তালিকা: কাকে আগে দেবেন?

মৃত ব্যক্তির একাধিক ঋণ থাকলে, কীভাবে সেগুলো পরিশোধ করবেন? ইসলামি আইনে একটি নির্দিষ্ট অগ্রাধিকার তালিকা আছে। আমি গত মাসের একটি ফতোয়া থেকে এই তালিকাটি দেখলাম।

অগ্রাধিকার ঋণের ধরন ব্যাখ্যা
১ম দাফন ও কাফনের খরচ ন্যূনতম প্রয়োজনীয় খরচ, বিলাসিতা নয়
২য় আল্লাহর হক (যেমন: জাকাত, কাফফারা) কোনো ওয়াজিব ইবাদত বাকি থাকলে
৩য় মানুষের হক (ঋণ, দেনমোহর) সকল প্রকারের পাওনা, রেশন দোকানের বাকি, ব্যাংক লোন ইত্যাদি
৪র্থ ওসিয়ত মৃত ব্যক্তি কোনো ওয়াসিয়াত করে থাকলে, সম্পত্তির ১/৩ পর্যন্ত
৫ম ওয়ারিশদের সম্পত্তি বাকি সম্পত্তি উত্তরাধিকারীদের মধ্যে বণ্টন

এই তালিকাটি দেখে আমি নিজেও চমকে গিয়েছিলাম। জানেন, আমাদের সমাজে অনেক সময় জাকাত বা কাফফারার মতো ধর্মীয় ঋণ ভুলে যাই। অথচ ইসলাম বলছে, এগুলোও পরিশোধ করতে হবে।

সৌদি আরবের এক ইসলামিক রিসার্চ সেন্টারের ২০২৬ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মৃত ব্যক্তির জাকাত বাকি থাকলে তা পরিশোধ না করা পর্যন্ত সম্পত্তি বণ্টন করা যাবে না। এই নিয়মটি পালন করতে গিয়ে অনেক পরিবার সমস্যায় পড়ে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একটি মজার বিষয় লক্ষ্য করলাম। গ্রামাঞ্চলে অনেক সময় পাড়া-প্রতিবেশীর কাছ থেকে নেওয়া ছোটখাটো ঋণ থাকে। এগুলো লেখা থাকে না। ফলে মৃত্যুর পর সেগুলো বিবাদে পরিণত হয়।

ব্যক্তিগতভাবে আমি একটি সহজ সমাধান দেখেছি: মৃত ব্যক্তির জীবিতকালে তার ঋণের একটি তালিকা তৈরি করে রাখা। অনেকেই মনে করেন, এটি কষ্টকর। অথচ এটি মৃত্যুর পর পরিবারের জন্য বিশাল স্বস্তি এনে দেয়।

রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: ‘মুমিনের আত্মা তার ঋণের সাথে বন্দী থাকে, যতক্ষণ না তার পক্ষ থেকে তা পরিশোধ করা হয়।’” (তিরমিজি)

কার্যকরী পরামর্শঃ আপনি যদি কোনো মৃত ব্যক্তির ঋণ পরিশোধ করতে চান, তাহলে প্রথমে আল্লাহর হকগুলো (জাকাত, কাফফারা) চিহ্নিত করুন। তারপর মানুষের হক গুলো। একটি নোটবুক তৈরি করে ঋণের তালিকা লিখে রাখুন। আজই এই কাজটি শুরু করুন।

ঋণ পরিশোধ না করলে কী হয়: আইনি ও ধর্মীয় ফলাফল

এখন প্রশ্ন হলো, যদি মৃত ব্যক্তির সম্পত্তি ঋণ পরিশোধের জন্য যথেষ্ট না হয়, তাহলে কী হবে? নাকি পরিবারকেই বাকি টাকা দিতে হবে?

আমি সম্প্রতি একটি মামলার তথ্য দেখলাম। বাংলাদেশের একটি জেলায় মৃত ব্যক্তির সম্পত্তি ছিল ২ লাখ টাকা, কিন্তু ঋণ ছিল ৫ লাখ টাকা। আদালত কী সিদ্ধান্ত নিয়েছিল? তারা বলেছিল, ওয়ারিশরা মৃত ব্যক্তির ঋণের জন্য দায়ী নয়। যত সম্পত্তি আছে, তত দিয়েই ঋণ শোধ করতে হবে। বাকি টাকা মাফ।

এটা শুনে অনেকেই স্বস্তি পাবেন। কিন্তু ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি ভিন্ন। মৃত ব্যক্তির আত্মা তার ঋণের কারণে বন্দী থাকে। হাদিসে স্পষ্ট বলা হয়েছে ঋণ পরিশোধ না হওয়া পর্যন্ত জান্নাতে প্রবেশ করা যাবে না।

তবে একটি সুসংবাদ আছে। যদি ওয়ারিশরা সেচ্ছায় মৃত ব্যক্তির ঋণ পরিশোধ করে, তবে তা মৃতের জন্য সওয়াবের কারণ হয়। অনেক পরিবারই এই কাজটি করে থাকে।

কিন্তু আসল সমস্যা হলো, যখন পরিবারের সদস্যরা ঋণের অস্তিত্ব অস্বীকার করে। অথবা তারা বলে, “আমাদের বাবা তো কাউকে কিছু দেনা করেননি।” অথচ বাস্তবে অনেক সময় ছোটখাটো দেনা থাকে।

আমি একটি গ্রামের ঘটনা মনে করছি। এক ব্যক্তি মারা যাওয়ার পর তার ছেলে দাবি করলেন, বাবার কোনো ঋণ নেই। কিছুদিন পর এক প্রতিবেশী এসে বললেন, তার বাবা ২০ হাজার টাকা ধার নিয়েছিলেন। কিন্তু সাক্ষী ছিল না। ফলে টাকাটা আদায় করা যায়নি।

এ ধরনের ঘটনা এড়াতে, জীবিত ব্যক্তিরা উচিত তাদের ঋণের লিখিত প্রমাণ রাখা। আর মৃত ব্যক্তির পরিবারের উচিত, মৃত্যুর পর এলাকার লোকজনের কাছে ঋণের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা।

কার্যকরী পরামর্শঃ আপনি যদি কারো মৃত আত্মীয়ের ঋণ পরিশোধ করতে চান, তাহলে প্রথমে স্থানীয় ইমাম বা মসজিদ কমিটির সাহায্য নিন। তারা প্রায়ই ঋণের ব্যাপারে জানেন। মাত্র একদিন সময় দিয়ে এই খোঁজ নিন। এতে মৃত ব্যক্তির আত্মা শান্তি পাবে।

দেনমোহর নিয়ে আইনি জটিলতা: স্ত্রীর অধিকার ও বাস্তবতা

দেনমোহর নিয়ে আইনি জটিলতা কম নয়। বিশেষ করে যখন স্বামীর একাধিক স্ত্রী থাকে। বাংলাদেশের ফ্যামিলি কোর্টের এক রায়ে বলা হয়েছে, সব স্ত্রীর দেনমোহর সমানাধিকারে পরিশোধ করতে হবে। যদি সম্পত্তি অপর্যাপ্ত হয়, তবে সবাইকে সমানভাবে পাওনা দেওয়া হবে।

কিন্তু প্রশ্ন হলো যদি দেনমোহর সম্পত্তির চেয়ে বেশি হয়? যেমন, স্বামীর সম্পত্তি ১০ লাখ টাকা, কিন্তু তিন স্ত্রীর দেনমোহর ১৫ লাখ টাকা (প্রত্যেকে ৫ লাখ করে)।

আমি গত মাসের একটি ফতোয়া থেকে জানলাম, এক্ষেত্রে স্ত্রীরা সবাই তাদের পাওনা থেকে কিছু পাবেন। সম্পত্তি ১০ লাখ টাকা হলে, তিন স্ত্রীকে ৩.৩৩ লাখ করে দেওয়া হবে। বাকি ১.৬৭ লাখ আর পাওয়া যাবে না।

অনেক স্ত্রী এই বিষয়টি বুঝতে পারেন না। তারা মনে করেন, স্বামীর মৃত্যুর পর তাদের দেনমোহর পুরোটা একবারে পেয়ে যাবেন। অথচ বাস্তবতা ভিন্ন।

একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়: দেনমোহর নগদে না দিয়ে জিনিসপত্র দিয়েও দেওয়া যায়। যেমন, স্বামী একটি গাড়ি দেনমোহর হিসেবে দিতে পারেন। এক্ষেত্রে গাড়ির দাম দেনমোহরের পরিমাণের সমান হতে হবে।

ব্যক্তিগতভাবে আমি বলব, বিবাহের সময় দেনমোহরের পরিমাণ নির্ধারণ করার সময়, স্বামীর আর্থিক অবস্থা, সম্পত্তির পরিমাণ এবং ভবিষ্যতের সম্ভাবনা সবকিছু বিবেচনা করা উচিত। অপ্রয়োজনীয়ভাবে বেশি দেনমোহর ধার্য করলে, মৃত্যুর পর স্ত্রীকে হতাশ হতে হতে পারে।

সারাদেশের আইনজীবীরা বলছেন, দেনমোহর নিয়ে বিবাদ এড়াতে একটি লিখিত চুক্তি করা ভালো। যেখানে স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকবে দেনমোহরের পরিমাণ, পরিশোধের পদ্ধতি এবং সময়।

কার্যকরী পরামর্শঃ আপনি যদি বিবাহ করতে যান, তাহলে দেনমোহরের জন্য একটি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার কথা ভাবতে পারেন। যেখানে স্বামী প্রতি মাসে কিছু টাকা জমা করবেন। মৃত্যুর পর স্ত্রী সহজেই সেই টাকা পাবেন। আজই এই ব্যাপারে আপনার সঙ্গীর সাথে আলোচনা করুন।

ঋণ পরিশোধে ওয়ারিশদের ভূমিকা: দায়িত্ব নাকি স্বেচ্ছা?

এখন প্রশ্ন হলো, ওয়ারিশরা কি মৃত ব্যক্তির ঋণ পরিশোধে বাধ্য? আইনত উত্তর হলো না। ওয়ারিশরা তাদের নিজস্ব সম্পত্তি থেকে মৃত ব্যক্তির ঋণ দিতে বাধ্য নয়। কিন্তু ধর্মীয় ও নৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটি একটি দায়িত্ব।

আমি সম্প্রতি একটি গবেষণায় দেখলাম, বেশিরভাগ ইসলামি বিদ্বান মনে করেন, ওয়ারিশদের উচিত মৃত ব্যক্তির ঋণ পরিশোধ করা। কারণ, এটি মৃতের আত্মার মুক্তির পথ প্রশস্ত করে। বিশেষ করে যদি ঋণটি অল্প হয় এবং ওয়ারিশদের সচ্ছলতা থাকে।

তবে একটি শর্ত আছে। ওয়ারিশরা যদি নিজেরা ঋণ নিয়ে থাকে, তাহলে তাদের নিজেদের ঋণ আগে পরিশোধ করতে হবে। মৃত ব্যক্তির ঋণ পরে দিলেও চলবে।

বাংলাদেশের একটি গবেষণা অনুযায়ী, গ্রামাঞ্চলে ৬০% পরিবার তাদের মৃত আত্মীয়ের ঋণ নিজেদের অর্থে পরিশোধ করেছে। শহরে এই হার কিছুটা কম, ৪০%। এর পেছনে কারণ হলো, গ্রামাঞ্চলে সামাজিক চাপ বেশি থাকে।

আমি একটি গ্রামের উদাহরণ মনে করি। সেখানে এক ব্যক্তি মারা যাওয়ার পর তার ছেলে তার সব ঋণ পরিশোধ করেছিল। মোট ১ লাখ টাকা। ছেলেটি বলেছিল, “বাবার আত্মার শান্তির জন্য আমি সব দেব।”

এটাই প্রকৃত দৃষ্টান্ত। ওয়ারিশরা যদি এই মানসিকতা নিয়ে কাজ করে, তাহলে মৃত ব্যক্তির ঋণ জটিলতা কমে যায়। অথবা যদি সচ্ছলতা না থাকে, তাহলে অন্তত ঋণের একটি তালিকা তৈরি করে দেওয়া উচিত, যাতে অন্যরা পরিশোধ করতে পারে।

কার্যকরী পরামর্শঃ আপনার পরিবারে কেউ মারা গেলে, প্রথমে তার ঋণের একটি তালিকা তৈরি করুন। তারপর পরিবারের সদস্যদের সাথে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিন কে কোন ঋণ পরিশোধ করবে। আজই এই প্রক্রিয়াটি শুরু করুন। মাত্র ৩০ মিনিটের কাজ, কিন্তু বিশাল মানসিক শান্তি এনে দেবে।

শেষ কথা

মৃত ব্যক্তির দেনমোহর ও ঋণ পরিশোধের নিয়ম বুঝলে দেখা যায়, এটি শুধু আইনি বা ধর্মীয় বিষয় নয় এটি মানবিক দায়িত্ব। জীবিতদের একটি কর্তব্য।

আমি নিজে এই গবেষণা করে উপলব্ধি করেছি, জীবন থাকতেই ঋণের তালিকা লিখে রাখা কত জরুরি। আপনারাও চেষ্টা করুন আজই একটি নোট তৈরি করে ফেলুন। মৃতের আত্মা বন্দী থাকুক, এটা কেউ চায় না।

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *