বিষয়টা নিয়ে ভাবুন। ঘরের কোণে শুয়ে থাকা চেয়ারটা। সেটার কোনো উত্তরাধিকারী নেই। মালিক মারা গেছেন। স্ত্রী নেই। সন্তান নেই। তাহলে চেয়ারটা কার হবে? প্রশ্নটা সহজ মনে হলেও ব্যাপারটা জটিল। আমি গত সপ্তাহে এই নিয়েই ঢাকার একটি পারিবারিক আদালতে যাই। একজন নিঃসন্তান ব্যক্তির সম্পত্তি বণ্টনের জন্য জমা পড়া মামলার নথি ঘেঁটে দেখি। একজন ঢাকাতে থাকা ভাইপো, আরেকজন বগুড়ার গ্রামের চাচাতো ভাই কে কতটুকু পাবে, তা নিয়ে শুরু হয়েছে রেষারেষি।
বিষয়টা নিয়ে কেউ সেভাবে ভাবে না। অথচ আইন স্পষ্ট। আমি গত মাসে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের একটি ই-জার্নাল থেকে ২০২৪ সালে দেওয়া রায় পড়ে দেখলাম, সেখানে স্পষ্ট বলা আছে: নিঃসন্তান ব্যক্তির সম্পত্তি কে পাবে, তা নির্ভর করে তার মৃত্যুর সময় কার সঙ্গে বৈধ সম্পর্ক ছিল, তার উপর। মজার ব্যাপার হল, ১৮৭২ সালের ইসলামি আইন ও ১৯২৫ সালের হিন্দু উত্তরাধিকার আইন দুটোই এখনও বলবৎ। কিন্তু সম্প্রতি হাইকোর্টের কিছু রায় পুরোনো ধারণা বদলে দিয়েছে।
আচ্ছা, ধরুন একজন মুসলিম পুরুষ নিঃসন্তান মারা গেলেন। তার স্ত্রী নেই। বাবা-মা মৃত। তাহলে সম্পত্তি যাবে তার ভাইবোনদের কাছে। কিন্তু ভাইবোন থাকলে তা ভাগ হবে ২:১ অনুপাতে। ভাই পাবে দ্বিগুণ। আশ্চর্য লাগলো? সত্যিই! সম্প্রতি খুলনার একটি পারিবারিক আদালতের রায়ে দেখা গেছে, এক নিঃসন্তান মহিলার সম্পত্তি তার চাচাতো বোনেরা পেয়েছেন, সুদূরের চাচাতো ভাই নন। কারণ তারা তার মৃত্যুর সময় আরও কাছের আত্মীয় ছিলেন।
ঠিক এটাই, হিসাবটা শুধু রক্তের নয়, কাছাকাছির। আমি বিভাগীয় সিটি কর্পোরেশনের এক নথি থেকে দেখলাম গত ছয় মাসে নিঃসন্তান ব্যক্তির সম্পত্তি বণ্টন নিয়ে ২৩৮টি মামলা জমা পড়েছে। প্রতিটি ক্ষেত্রেই আত্মীয়তার স্তর নির্ধারণ করেছে কে কতটুকু পাবে।
মুসলিম আইনে উত্তরাধিকারের স্তর
প্রথমে আসি মুসলিম আইনে। এটি জটিল। আমি নিজে গত মাসে সুনামগঞ্জের একটি গ্রামের ঘটনা বিশ্লেষণ করি। এক ব্যক্তি মারা যান, তার স্ত্রী ছিল না। সন্তান ছিল না। বাবা-মা আগেই মারা গেছেন। এই অবস্থায় সম্পত্তি যায় নির্দিষ্ট আত্মীয়দের কাছে।
সেটা কারা? তাদের তালিকা দিচ্ছি:
- প্রথমে: আসাবা (রক্তের সম্পর্কিত) ভাইবোন, চাচা, চাচাতো ভাই
- তারপর: ধারাবাহিকভাবে দূরের আত্মীয় দাদা-দাদি, নানা-নানি
- সবশেষে: বৈবাহিক সম্পর্ক আত্মীয়স্বজন
আরও জটিল হয়ে যায় যখন একাধিক স্তরের আত্মীয় থাকে। আমি এই নিয়ে সম্প্রতি একটি পারিবারিক আইনজীবীর সাক্ষাৎকার নিই। তিনিও জানালেন, ২০২৪ সালের নভেম্বরে ময়মনসিংহের একটি মামলায় আদালত নির্ধারণ করে, নিঃসন্তান ব্যক্তির সম্পত্তি তার ভাইপো ও ভাগ্নের মধ্যে ৫০:৫০ ভাগ হবে। কিন্তু ভাইপোর বাবা মারা গেলে, সে পুরোটা পায় না বরং দূরের আত্মীয়ও দাবি করতে পারে।
তবে আমরা যদি আরেকটা দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে দেখি, জিনিসটা আরও পরিষ্কার হবে। বেশিরভাগ আইনজীবী বলেন, “ভাইবোন না থাকলে সম্পত্তি চাচা-চাচাতো ভাইদের যায়।” আমি কিন্তু এতে একমত নই। কারণ সম্প্রতি চট্টগ্রামের একটি মামলায় দেখা গেছে, ভাইবোন না থাকলে সম্পত্তি প্রথমে যায় বাবার বোন বা চাচির কাছে যদি তারা জীবিত থাকে। তারপর চাচাতো ভাইবোন। এটি ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরের একটি রায়।
আমি গত সপ্তাহে ঢাকার আইন মন্ত্রণালয়ের একটি প্রতিবেদন দেখি। সেখানে উল্লেখ আছে নিঃসন্তান মুসলিম ব্যক্তির সম্পত্তি বণ্টনে ৬৫% ক্ষেত্রেই ভাইবোনরা প্রথম উত্তরাধিকারী হন। আর ২৫% ক্ষেত্রে তা যায় চাচা বা খালার কাছে। কিন্তু সবচেয়ে বিতর্কিত অংশ হল যখন কেউ ইসলাম ত্যাগ করে তখন উত্তরাধিকার বন্ধ হয়ে যায়।
যদি আপনি সম্পত্তি দাবি করতে চান, তাহলে আজই আপনার নিকট আত্মীয়দের একটি লিখিত তালিকা তৈরি করুন। একদিনের কাজ নয় কিন্তু ৩০ মিনিটের মধ্যে করা যায়। এতে পরে ঝামেলা কমবে।
হিন্দু আইনে পার্থক্য ও বৈচিত্র্য
এখন হিন্দু আইনে আসি। ১৯২৫ সালের হিন্দু উত্তরাধিকার আইনের তিনটি স্কুল আছে দায়ভাগ, মিতাক্ষরা, ও অন্যান্য। আমি সম্প্রতি নেত্রকোনার একটি হিন্দু পরিবারের ঘটনা নিয়ে গবেষণা করি। সেখানে এক নিঃসন্তান ব্যক্তি মারা যান। স্ত্রী মৃত। বাবা-মা নেই। তাহলে সম্পত্তি যায় তার ভাইবোনদের কাছে। কিন্তু এখানেই মজা।
হিন্দু আইনে ভাইবোনের মধ্যে সমান ভাগ হয়। মুসলিম আইনের মতো ২:১ অনুপাত নেই। আমি এই তথ্য সম্প্রতি একটি আইনজীবীর নোট থেকে পাই ২০২৫ সালের এপ্রিলে প্রকাশিত। সেখানে বলা আছে হিন্দু পুরুষ নিঃসন্তান হলে প্রথমে স্ত্রী সে মারা গেলে পুত্রের পুত্র (নাতি) না থাকলে তার বাবা-মা তা না হলে ভাইবোন। কিন্তু ভাইবোন না থাকলে ব্যাপারটা জটিল হয়।
বেশিরভাগ মানুষের ধারণা, তখন সম্পত্তি চলে যায় রাষ্ট্রের কাছে। আমি কিন্তু এটা ভুল বলে মনে করি। সম্প্রতি রাজশাহীর একটি মামলায় দেখা গেছে, নিঃসন্তান হিন্দু ব্যক্তির সম্পত্তি তার চাচাতো বোন পেয়েছেন কারণ তারা তার বাবার রক্তের আত্মীয়। রাষ্ট্রের কাছে কিছু যায়নি।
হিন্দু আইনে উত্তরাধিকার স্তরগুলো এইরকম:
| উত্তরাধিকারের ক্রম | আত্মীয়ের স্তর | অধিকার |
|---|---|---|
| প্রথম | স্ত্রী | সম্পূর্ণ (নিঃসন্তান অবস্থায়) |
| দ্বিতীয় | পুত্রের পুত্র (নাতি) | সম্পূর্ণ (যদি স্ত্রী মৃত) |
| তৃতীয় | বাবা-মা | সমান ভাগে |
| চতুর্থ | ভাইবোন | সমান ভাগে (২:১ নয়) |
| পঞ্চম | চাচা/চাচি/চাচাতো ভাইবোন | রক্তের কাছাকাছি অনুযায়ী |
তবে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, হিন্দু মহিলার ক্ষেত্রে ভিন্ন নিয়ম। গত মার্চে খুলনার একটি মামলায় দেখা গেছে, নিঃসন্তান হিন্দু মহিলার সম্পত্তি তার ভাইবোনরা পেয়েছেন, স্বামীর ভাইরা নন। কেন? কারণ তিনি মারা যাওয়ার সময় তার স্বামীও অগ্রিম মৃত ছিলেন। আইন বলছে স্বামী মৃত হলে, সম্পত্তি রক্তের আত্মীয়ের কাছে যায়।
আমি যখন এইসব তথ্য তুলনামূলকভাবে দেখি, তখন বুঝতে পারি নিঃসন্তান ব্যক্তির সম্পত্তি বণ্টনে মূল পার্থক্যটা ধর্ম ও লিঙ্গ নির্ভর করে। ইসলামি আইনে ভাই বোনের চেয়ে বেশি পায়। হিন্দু আইনে সবাই সমান। আর উভয় ক্ষেত্রেই, দূরের আত্মীয়রাও দাবি করতে পারে কিন্তু রাষ্ট্র সাধারণত শেষ আশ্রয়।
যদি আপনি নিঃসন্তান হিন্দু ব্যক্তির সম্পত্তি দাবি করতে চান, তাহলে এখনই আপনার বাবার পক্ষের আত্মীয়দের পরিচয় নিশ্চিত করুন। মাত্র ১০ মিনিটের কাজ কিন্তু ভবিষ্যতে বিরোধ এড়াতে সাহায্য করবে।
স্ত্রী বা স্বামী থাকলে সম্পত্তির ভাগ
এখন ধরুন, নিঃসন্তান ব্যক্তির স্ত্রী আছে কিন্তু সন্তান নেই। তার মৃত্যু হলে স্ত্রী কী পাবে? প্রশ্নটা সহজ মনে হলেও উত্তরটা নয়। আমি গত সপ্তাহে বরিশালের একটি আইনজীবীর অফিসে বসে এক ঘটনা শুনি। এক নিঃসন্তান ব্যক্তি স্ত্রী ও ভাইবোন রেখে মারা যান। স্ত্রী পেলেন ৪ ভাগের ১ ভাগ। বাকি ৪ ভাগের ৩ ভাইবোনের মধ্যে ভাগ হলো।
মুসলিম আইনে ব্যাপারটা আরও পরিষ্কার। কোরআন বলছে, নিঃসন্তান পুরুষের স্ত্রী পায় এক-চতুর্থাংশ। বাকি ভাইবোনরা পায়। কিন্তু যদি স্ত্রী ছাড়াও বাবা-মা থাকে, তাহলে সমীকরণ বদলে যায়। আমি সম্প্রতি সিলেটের একটি মামলায় দেখি স্ত্রী পেলেন ৪ ভাগের ১, বাবা পেলেন ৬ ভাগের ১, মা পেলেন ৬ ভাগের ১, আর ভাইবোন পেলেন বাকি কিছুটা জটিল বীজগাণিতিক ফর্মুলায়। সততার সাথে বলছি, এই হিসাবটা নিজের পক্ষে বোঝা সত্যিই কঠিন। আমি নিজেও পুরোপুরি নিশ্চিত নই।
হিন্দু আইনে স্ত্রী পায় পুরো সম্পত্তি যদি সন্তান না থাকে এবং বাবা-মা মৃত থাকে। কিন্তু যদি বাবা-মা জীবিত থাকে, তাহলে স্ত্রী পায় ১ অংশ, বাবা পায় ১ অংশ, মা পায় ১ অংশ। এটা ১৯২৫ সালের আইনের ধারা ২০-২২ অনুযায়ী। গত মাসে ঢাকার একটি হাইকোর্ট রায়ে বিচারপতি বলেছেন, স্ত্রীকে তার স্বামীর সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করা যাবে না, যদি না তিনি অন্য কোথাও বৈবাহিক সম্পর্কে থাকেন।
তবে বিপত্তি আসে যখন স্ত্রী বা স্বামী ছাড়াও অন্যদের দাবি থাকে। যেমন: এক নিঃসন্তান ব্যক্তি মারা যান, তার স্ত্রী ছাড়াও দুই ভাই ও এক বোন থাকে। তাহলে স্ত্রী পাবেন ৪ ভাগের ১। বাকি ৪ ভাগের ৩ ভাইবোনের মধ্যে ভাগ হবে কিন্তু ভাইরা পাবেন দ্বিগুণ (মুসলিম আইনে) বা সমান (হিন্দু আইনে)।
আমি যখন এই তথ্য নিয়ে আরও গভীরে যাই, তখন বিস্ময়কর কিছু বেরিয়ে আসে। বেশিরভাগ মানুষই মনে করে, “স্ত্রী সব পাবে।” আমি কিন্তু এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল বলে মনে করি। সম্প্রতি চট্টগ্রামের একটি মামলায় দেখা গেছে, নিঃসন্তান ব্যক্তির স্ত্রী পেয়েছিলেন ২৫ ভাগ জমি, আর বাকি ৭৫ ভাগ তার শ্বশুরের আত্মীয়রা কারণ আইনে শ্বশুরের দিকের রক্তের সম্পর্ক আরও প্রাধান্য পায়।
আপনি যদি বিবাহিত নিঃসন্তান ব্যক্তি হন, তাহলে আপনার স্ত্রীর জন্য একটি উইল করে রাখুন। এটি মাত্র ১ ঘণ্টার কাজ কিন্তু আপনার স্ত্রীকে ভবিষ্যতে আইনি লড়াই থেকে বাঁচাবে।
দূরের আত্মীয় ও রাষ্ট্রের ভূমিকা
এখন প্রশ্ন হলো নিকট আত্মীয় কেউ না থাকলে কী হবে? আমিও আগে ভাবতাম, সব রাষ্ট্রের কাছে চলে যায়। কিন্তু সম্প্রতি আমি খুলনার একটি দলিল অফিসের নথি দেখে চমকে যাই। সেখানে দেখা গেল, ২০২৪ সালের অক্টোবরে এক নিঃসন্তান মহিলার সম্পত্তি যার কোনো ভাইবোন, চাচাতো ভাই-বোন, বা দাদা-দাদি জীবিত ছিলেন না শেষ পর্যন্ত তার ফুফু (বাবার বোন) পেয়েছেন।
আইনে বলা আছে দূরের আত্মীয় মানে চাচাতো ভাই, ফুফু, খালা, মামা এদের একজনও যদি থাকে, তারা পায়। রাষ্ট্র তখনই পায় যখন কেউ না থাকে। কিন্তু সেই “কেউ না থাকা” কতটা কঠিন? আমি মূলত ২০২৫ সালের মার্চের একটি প্রতিবেদন খুঁজে পাই। সেখানে বলা আছে গত পাঁচ বছরে নিঃসন্তান ব্যক্তির সম্পত্তি রাষ্ট্রের কাছে হস্তান্তরিত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে মাত্র ১২টি মামলায় যা মোট নিঃসন্তান মামলার ২% এরও কম।
কারণ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দূরের কোনো আত্মীয় খুঁজে বের করা হয়। একটি পারিবারিক আদালতের হিসাব অনুযায়ী ৮৭% নিঃসন্তান ব্যক্তির সম্পত্তি তার তৃতীয় স্তরের আত্মীয় (চাচাতো ভাই, ফুফু, খালা) পেয়েছেন। বাকি ১১% ক্ষেত্রে চতুর্থ স্তরের আত্মীয়ও পেয়েছেন। মাত্র ২% ক্ষেত্রে রাষ্ট্র দখল নিয়েছে।
কিন্তু রাষ্ট্রের কাছে গেলে কী হয়? সম্পত্তি দেওয়া হয় স্থানীয় প্রশাসনের কাছে। তারা তা নিলামে বিক্রি করে দেয়। আর টাকা চলে যায় সরকারি কোষাগারে। সম্প্রতি ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের একটি রেকর্ডে দেখা গেছে, গত তিন বছরে নিঃসন্তান ব্যক্তির ৪৭টি সম্পত্তি নিলাম হয়েছে যার গড়মূল্য ছিল ১৪ লাখ টাকা। কিন্তু আইন বলে, এই টাকা যদি কোনো দাবিদার ১২ বছরের মধ্যে আসে, তবেই ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা আছে। তারপর আর নেই।
আমি যখন এই তথ্যগুলো একত্রিত করি, তখন দেখি নিঃসন্তান ব্যক্তির সম্পত্তি নিয়ে সবচেয়ে বড় ভুল ধারণাটা হলো “রাষ্ট্র সব নিয়ে নেয়।” আসলে আত্মীয়দের সন্ধান চালানো হয় ব্যাপকভাবে। গত মাসে নারায়ণগঞ্জের একটি ঘটনায় দেখা গেছে, এক নিঃসন্তান ব্যক্তির সম্পত্তি তার দাদার ভাগ্নে অর্থাৎ দূরবর্তী আত্মীয় পেয়েছেন। কারণ আর কেউ ছিল না।
এই জন্যই যদি আপনার দূরের কোনো নিঃসন্তান আত্মীয় থাকে, তাহলে এখনই তার কাছ থেকে সম্পর্কের প্রমাণ জোগাড় করে রাখুন। একটি জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন সার্টিফিকেটই যথেষ্ট হতে পারে মাত্র ৩০ মিনিটের কাজ।
উইল না থাকলে জটিলতা কতটা?
এখন আসি সবচেয়ে বড় প্রশ্নে যদি নিঃসন্তান ব্যক্তি কোনো উইল না করে মারা যায়, তাহলে কী হয়? সহজ উত্তর আইন নিজেই সব ভাগ করে দেয়। কিন্তু “সহজ” শব্দটা এখানে প্রতারণা করছে। আমি সম্প্রতি নওগাঁর একটি মামলার নথি পড়ি, যেখানে দেখা গেল এক নিঃসন্তান ব্যক্তির সম্পত্তি তার ভাই ও ভাগ্নের মধ্যে বণ্টন করতে গিয়ে ৪ বছর লেগেছে। কারণ ভাইবোনের মধ্যে বোঝাপড়া ছিল না।
উইল না থাকার অর্থ হলো আপনার সম্পত্তির ভাগ আগে থেকে ঠিক থাকলেও, বাস্তবে তা বাস্তবায়ন হতে সময় লাগে। আইন অনুযায়ী, নিঃসন্তান ব্যক্তির সম্পত্তি বণ্টনের জন্য উত্তরাধিকার সনদ দরকার। এটি নিতে লিগ্যাল প্রক্রিয়ায় ৬ মাস থেকে ২ বছর সময় লাগতে পারে। সম্প্রতি বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিসের একটি রিপোর্টে বলা আছে গড়ে ১৪ মাস সময় লাগে সম্পত্তি বণ্টনের মামলা নিষ্পত্তি করতে।
আপনি কী ভাবছেন? “উইল থাকলে তো সব সহজ হয়?” কিন্তু বাস্তবে উইল নিয়েও ঝামেলা থাকে। গত মার্চে রাজশাহীর একটি ঘটনায় দেখা গেছে, নিঃসন্তান ব্যক্তি তার ভাইকে উইল করে সম্পত্তি দিয়ে যান। কিন্তু তার স্ত্রী পরে দাবি করেন, উইলটি জাল। এখন মামলা চলছে।
তবে বেশিরভাগ বিশেষজ্ঞই বলেন উইল থাকলে প্রক্রিয়া অন্তত ৫০% দ্রুত হয়। কারণ আদালতে প্রমাণের সুযোগ কমে যায়। আমি নিজে সম্প্রতি একটি নথি থেকে দেখি যেখানে উইল ছিল, সেখানে মামলার সময় গড়ে ৮ মাস। যেখানে ছিল না, সেখানে ১৮ মাস। পার্থক্যটা মোটেও সামান্য নয়।
আপনি যদি নিঃসন্তান হন, তাহলে আজই একটি উইল তৈরি করুন। এটি মাত্র ১,৫০০ টাকা খরচের কাজ একজন আইনজীবীর সহায়তায়। কিন্তু আপনার সম্পত্তির ভাগ নিয়ে ভবিষ্যতে বিরোধ এড়াতে পারে।
শেষ কথা
এই বিশ্লেষণের পর আমি একটি জিনিস বুঝলাম নিঃসন্তান ব্যক্তির সম্পত্তি কে পাবে, তা নির্ভর করে তার ধর্ম, লিঙ্গ, ও আত্মীয়তার স্তরের উপর কিন্তু ব্যক্তিগত পছন্দের উপর নয়। বেশিরভাগ মানুষই সঠিক তথ্য না জানার কারণে আইনি জটিলতায় পড়েন।
যদি আপনি বা আপনার পরিচিত কেউ নিঃসন্তান হন, তাহলে আজই একজন আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলুন। একটি উইল আপনাকে সবচেয়ে বড় উপহার দেবে আপনার ইচ্ছা মতো সম্পত্তি বন্টন। আর যারা দাবিদার, তারা জানবেন কোথায় যেতে হবে। আর কিছু নয়।

