কোনো মুসলিম ব্যক্তি মারা গেলে তার রেখে যাওয়া সম্পত্তি ইচ্ছামতো ভাগ করার বিষয় নয়। ইসলামে উত্তরাধিকার বণ্টনের জন্য নির্দিষ্ট নীতিমালা রয়েছে, যাকে সাধারণভাবে ফারায়েজ বলা হয়। এখানে কে উত্তরাধিকারী হবেন, কার অংশ কত হবে এবং সম্পত্তি ভাগ করার আগে কোন দায় পরিশোধ করতে হবে এসব বিষয় কোরআন, সুন্নাহ ও ইসলামী আইনশাস্ত্রে বিস্তারিতভাবে নির্ধারিত হয়েছে।
ফারায়েজ বোঝার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভুল হলো শুধু “ছেলে দুই ভাগ, মেয়ে এক ভাগ” সূত্রটিকেই পুরো উত্তরাধিকার আইন মনে করা। বাস্তবে স্বামী বা স্ত্রী, পিতা-মাতা, সন্তান, ভাইবোন এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে নাতি-নাতনির উপস্থিতি পুরো হিসাব পরিবর্তন করে দিতে পারে। কোরআনের সূরা আন নিসার ১১, ১২ ও ১৭৬ নম্বর আয়াত উত্তরাধিকারের প্রধান অংশগুলোর মৌলিক ভিত্তি নির্ধারণ করেছে।
বাংলাদেশে মুসলিম উত্তরাধিকার বণ্টনের ক্ষেত্রে শরিয়াহভিত্তিক উত্তরাধিকার নীতির পাশাপাশি দেশের প্রযোজ্য আইনও বিবেচনা করতে হয়। বিশেষ করে কোনো ছেলে বা মেয়ে উত্তরাধিকার খোলার আগে মারা গেলে তার জীবিত সন্তানদের অংশ নির্ধারণে ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশের ৪ ধারার বিশেষ বিধান প্রযোজ্য হতে পারে। তাই বাস্তব সম্পত্তি ভাগের আগে মৃত ব্যক্তির সম্পদ, দায় এবং মৃত্যুর সময় জীবিত উত্তরাধিকারীদের পূর্ণ তালিকা তৈরি করে যোগ্য আলেম এবং প্রয়োজন হলে উত্তরাধিকার বিষয়ে অভিজ্ঞ আইনজীবীর মাধ্যমে হিসাব যাচাই করা উচিত।
ফারায়েজ কী এবং কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ?
ফারায়েজ বলতে মৃত ব্যক্তির পরিত্যক্ত সম্পত্তিতে বৈধ উত্তরাধিকারীদের নির্ধারিত অধিকার ও অংশের হিসাবকে বোঝায়। এটি শুধু জমি ভাগের নিয়ম নয়। মৃত ব্যক্তির মালিকানাধীন নগদ অর্থ, জমি, বাড়ি, ব্যবসায়িক অংশ, পাওনা অর্থ, স্বর্ণ বা অন্যান্য বৈধ সম্পদও পরিত্যক্ত সম্পত্তির অংশ হতে পারে। তবে সব সম্পদের মোট মূল্যই সরাসরি উত্তরাধিকারীদের মধ্যে ভাগ হয়ে যায় না। প্রথমে মৃত ব্যক্তির প্রকৃত সম্পত্তি ও দায় নির্ধারণ করতে হয়।
সম্পত্তি বণ্টনের আগে যে কাজগুলো করতে হয়
ফারায়েজের হিসাব শুরু করার আগে সম্পত্তির একটি পরিষ্কার তালিকা তৈরি করা জরুরি। সাধারণভাবে প্রয়োজনীয় কাফন-দাফনের ব্যয় পরিশোধ, মৃত ব্যক্তির প্রমাণিত ঋণ ও আর্থিক দায় নিষ্পত্তি এবং বৈধ ওসিয়ত কার্যকর করার পর অবশিষ্ট সম্পত্তি উত্তরাধিকারীদের মধ্যে ভাগ করা হয়। কোরআনে উত্তরাধিকার বণ্টনের ক্ষেত্রে ঋণ ও ওসিয়ত পূরণের কথা স্পষ্টভাবে এসেছে। ইসলামী আইনশাস্ত্রে ঋণকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
প্রচলিত সুন্নি ফিকহ অনুযায়ী বৈধ ওসিয়ত সাধারণভাবে নিট পরিত্যক্ত সম্পত্তির এক-তৃতীয়াংশের মধ্যে সীমিত রাখা হয়। নির্ধারিত উত্তরাধিকারীর পক্ষে ওসিয়ত, এক-তৃতীয়াংশের বেশি ওসিয়ত অথবা অন্য উত্তরাধিকারীদের অধিকার প্রভাবিত করে এমন কোনো ব্যবস্থা থাকলে বিষয়টি আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। তাই বড় অঙ্কের ওসিয়ত বা জটিল পারিবারিক পরিস্থিতিতে নিজে থেকে চূড়ান্ত হিসাব না করে যোগ্য আলেমের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
কারা উত্তরাধিকারী হতে পারেন?
ইসলামী উত্তরাধিকার ব্যবস্থায় কিছু আত্মীয় নির্ধারিত অংশ পান, আবার কিছু উত্তরাধিকারী নির্ধারিত অংশ দেওয়ার পর অবশিষ্ট সম্পত্তি পেতে পারেন। ফিকহে এদের মধ্যে জাওয়িল ফুরূদ ও আসাবা ধরনের শ্রেণিবিন্যাস ব্যবহৃত হয়। তবে শুধু আত্মীয়তার সম্পর্ক থাকলেই প্রত্যেক ব্যক্তি সব পরিস্থিতিতে অংশ পান না। অপেক্ষাকৃত নিকটবর্তী কোনো উত্তরাধিকারীর উপস্থিতির কারণে দূরবর্তী আত্মীয়ের অধিকার বন্ধ হতে পারে। এই নীতিকে হাজব বলা হয়।
এ কারণেই শুধু মৃত ব্যক্তির সন্তান সংখ্যা জানলে সঠিক ফারায়েজ হিসাব করা যায় না। মৃত্যুর সময় তার পিতা, মাতা, স্বামী বা স্ত্রী, ছেলে, মেয়ে, ভাইবোন এবং প্রাসঙ্গিক অন্যান্য আত্মীয়দের মধ্যে কারা জীবিত ছিলেন তা একসঙ্গে জানতে হয়।
ছেলে ও মেয়ের সম্পত্তির অংশ
মৃত ব্যক্তির ছেলে ও মেয়ে একসঙ্গে উত্তরাধিকারী হলে একই স্তরের সন্তানদের মধ্যে সাধারণ নিয়ম হলো একজন ছেলে একজন মেয়ের দ্বিগুণ অংশ পাবে। কিন্তু এটিকে “সব পুরুষ সব নারীর দ্বিগুণ পায়” এমন সাধারণ সূত্র হিসেবে ব্যবহার করা ভুল। একজন স্ত্রী, মা, একমাত্র কন্যা কিংবা অন্য কোনো নারী উত্তরাধিকারীর অংশ সম্পূর্ণ ভিন্ন নিয়মে নির্ধারিত হতে পারে।
ছেলে না থাকলে একজন কন্যা নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে অর্ধেক পেতে পারেন। দুই বা ততোধিক কন্যা এবং কোনো ছেলে না থাকলে তারা সম্মিলিতভাবে দুই-তৃতীয়াংশ পেতে পারেন। এরপর অবশিষ্ট সম্পত্তি কার কাছে যাবে তা অন্য জীবিত উত্তরাধিকারীদের ওপর নির্ভর করে। তাই শুধু কন্যাদের অংশ বের করেই হিসাব শেষ করা যায় না।
স্বামী ও স্ত্রীর নির্ধারিত অংশ
স্ত্রী মারা গেলে তাঁর সন্তান বা প্রযোজ্য ক্ষেত্রে সন্তানের বংশধর না থাকলে স্বামী সাধারণভাবে অর্ধেক অংশ পান; এমন বংশধর থাকলে স্বামীর অংশ এক-চতুর্থাংশ হয়। স্বামী মারা গেলে তাঁর সন্তান বা প্রযোজ্য ক্ষেত্রে সন্তানের বংশধর না থাকলে স্ত্রী এক-চতুর্থাংশ এবং থাকলে স্ত্রী এক-অষ্টমাংশ পান। একাধিক স্ত্রী থাকলে স্ত্রীদের জন্য নির্ধারিত অংশটি তাঁরা সম্মিলিতভাবে পান।
পিতা ও মাতার অংশ কীভাবে নির্ধারিত হয়?
মৃত ব্যক্তির সন্তান থাকলে কোরআনের নির্দেশ অনুযায়ী পিতা ও মাতা প্রত্যেকে সাধারণভাবে এক-ষষ্ঠাংশ করে নির্ধারিত অংশ পেতে পারেন। সন্তান না থাকলে হিসাব পরিবর্তিত হয়। কোনো কোনো অবস্থায় মাতা এক-তৃতীয়াংশ পান, আবার ভাইবোনের উপস্থিতিসহ নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে তার অংশ এক-ষষ্ঠাংশ হতে পারে। পিতার ক্ষেত্রে নির্ধারিত অংশের পাশাপাশি অবশিষ্ট সম্পত্তির প্রশ্নও কিছু পরিস্থিতিতে আসতে পারে। এজন্য পিতা-মাতার অংশকে আলাদা করে নয়, পুরো উত্তরাধিকার কাঠামোর মধ্যে হিসাব করতে হয়।
ভাইবোন কখন সম্পত্তির অংশ পান?
ভাইবোনের অংশ নির্ধারণে মৃত ব্যক্তির সন্তান, পিতা এবং অন্যান্য নিকটবর্তী উত্তরাধিকারীর উপস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ। কোরআনের সূরা আন নিসার ১৭৬ নম্বর আয়াতে কালালা সম্পর্কিত বিশেষ অবস্থায় ভাইবোনের অংশের নির্দেশনা রয়েছে। সেই নির্দিষ্ট অবস্থায় একজন বোন অর্ধেক, দুই বোন সম্মিলিতভাবে দুই-তৃতীয়াংশ এবং ভাই-বোন একসঙ্গে থাকলে একজন ভাই একজন বোনের দ্বিগুণ অংশ পান। তবে ভাইবোনের ধরন ও অন্য উত্তরাধিকারীদের উপস্থিতির কারণে হিসাব পরিবর্তিত হতে পারে। তাই ভাইবোনের অংশ পুরো পারিবারিক কাঠামো বিবেচনা করে নির্ধারণ করতে হয়।
হাজব, আওল ও রদ কেন গুরুত্বপূর্ণ?
ফারায়েজের জটিলতা শুধু নির্ধারিত ভগ্নাংশ মুখস্থ করার মধ্যে নয়; কোন উত্তরাধিকারী কোন পরিস্থিতিতে অংশ পাবেন তা নির্ধারণ করাই মূল বিষয়। হাজবের কারণে নিকটবর্তী উত্তরাধিকারীর উপস্থিতিতে দূরবর্তী কোনো উত্তরাধিকারীর অংশ পুরোপুরি বন্ধ হতে পারে বা তার প্রাপ্য অংশে পরিবর্তন আসতে পারে। নির্ধারিত অংশগুলোর যোগফল সম্পত্তির তুলনায় বেশি হলে আওল এবং কিছু ক্ষেত্রে নির্ধারিত অংশ দেওয়ার পর সম্পত্তি অবশিষ্ট থাকলে রদের হিসাব প্রয়োজন হয়। তাই এসব অবস্থায় সাধারণ অনুপাত ব্যবহার না করে পুরো উত্তরাধিকার কাঠামো অনুযায়ী হিসাব করা উচিত।
বাংলাদেশে পূর্বমৃত ছেলে বা মেয়ের সন্তানদের বিশেষ অধিকার
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে পূর্বমৃত ছেলে বা মেয়ের সন্তানদের বিষয়ে ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশের ৪ ধারা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কোনো ব্যক্তির ছেলে বা মেয়ে উত্তরাধিকার খোলার আগে মারা গেলে এবং সেই পূর্বমৃত ছেলে বা মেয়ের সন্তান উত্তরাধিকার খোলার সময় জীবিত থাকলে, তারা শাখাভিত্তিকভাবে তাদের পিতা বা মাতা জীবিত থাকলে যে অংশ পেতেন তার সমপরিমাণ অংশ পাওয়ার অধিকারী হয়। বাস্তব বণ্টনের ক্ষেত্রে এই বিধান পারিবারিক তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে প্রয়োগ করতে হবে।
একটি সহজ ফারায়েজ হিসাবের উদাহরণ
ধরা যাক, একজন ব্যক্তি প্রয়োজনীয় ব্যয়, সব প্রমাণিত ঋণ ও বৈধ ওসিয়ত নিষ্পত্তির পর ২৪ লাখ টাকা রেখে মারা গেলেন। তাঁর জীবিত উত্তরাধিকারী হলেন স্ত্রী, পিতা, মাতা, একজন ছেলে ও একজন মেয়ে এবং এই হিসাবের জন্য প্রাসঙ্গিক অন্য কোনো উত্তরাধিকারী নেই। সন্তান থাকার কারণে স্ত্রী পাবেন এক-অষ্টমাংশ বা ৩ লাখ টাকা। পিতা পাবেন এক-ষষ্ঠাংশ বা ৪ লাখ টাকা এবং মাতা পাবেন এক-ষষ্ঠাংশ বা ৪ লাখ টাকা। অবশিষ্ট ১৩ লাখ টাকা ছেলে ও মেয়ের মধ্যে দুই অনুপাত এক হিসেবে ভাগ হবে। এতে ছেলে প্রায় ৮ লাখ ৬৬ হাজার ৬৬৭ টাকা এবং মেয়ে প্রায় ৪ লাখ ৩৩ হাজার ৩৩৩ টাকা পাবেন। এটি কেবল এই নির্দিষ্ট পারিবারিক কাঠামোর উদাহরণ; উত্তরাধিকারীর তালিকা পরিবর্তিত হলে হিসাবও পরিবর্তিত হতে পারে।
সম্পত্তি ভাগ করার সময় যে ভুলগুলো এড়ানো উচিত
প্রয়োগগতভাবে সবচেয়ে নিরাপদ পদ্ধতি হলো আগে সম্পত্তি ভাগ না করে তথ্য যাচাই করা। মৃত ব্যক্তির সম্পদের তালিকা, ঋণ, পাওনা, ওসিয়ত এবং মৃত্যুর তারিখে জীবিত সব সম্ভাব্য উত্তরাধিকারীর তালিকা লিখিতভাবে তৈরি করুন। এরপর কে উত্তরাধিকারী এবং কে হাজবের কারণে বাদ পড়বেন তা নির্ধারণ করুন। সবশেষে ভগ্নাংশকে জমির পরিমাণ বা টাকার অঙ্কে রূপান্তর করুন। মৌখিক পারিবারিক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর না করে হিসাব ও সম্মতির নথি সংরক্ষণ করাও ভবিষ্যৎ বিরোধ কমাতে সহায়ক।
ফারায়েজ সম্পর্কে ১০টি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ও উত্তর
১. ফারায়েজ কি শুধু জমি ও বাড়ির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য?
না। উত্তরাধিকারযোগ্য সম্পত্তির মধ্যে মৃত ব্যক্তির মালিকানাধীন জমি, বাড়ি, নগদ অর্থ, স্বর্ণ, ব্যবসায়িক অংশ, ব্যাংকে থাকা অর্থ, আদায়যোগ্য পাওনা এবং অন্যান্য বৈধ সম্পদ থাকতে পারে। প্রথমে কোন সম্পদ সত্যিই মৃত ব্যক্তির মালিকানাধীন ছিল এবং কোনটির বিপরীতে দায় রয়েছে তা নির্ধারণ করতে হবে।
২. ছেলে থাকলে কি মেয়েও সম্পত্তি পায়?
হ্যাঁ। ছেলে ও মেয়ে একই সঙ্গে সন্তান হিসেবে উত্তরাধিকারী হলে সাধারণ নিয়মে একজন ছেলে একজন মেয়ের দ্বিগুণ অংশ পায়। এর অর্থ মেয়ে বাদ পড়ে না। বরং অবশিষ্ট উত্তরাধিকারযোগ্য সম্পত্তি সন্তানদের মধ্যে নির্ধারিত অনুপাতে ভাগ হয়।
৩. কোনো ছেলে না থাকলে একমাত্র মেয়ে কত অংশ পেতে পারে?
কোরআনের নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী ছেলে না থাকলে একজন কন্যা নির্দিষ্ট অবস্থায় অর্ধেক অংশ পেতে পারেন। দুই বা ততোধিক কন্যা থাকলে তারা সম্মিলিতভাবে দুই-তৃতীয়াংশ পেতে পারেন। তবে বাকি সম্পত্তির হিসাব অন্য উত্তরাধিকারীদের উপস্থিতির ওপর নির্ভর করবে।
৪. স্ত্রী বা স্বামীর অংশ কি সব সময় একই থাকে?
না। সন্তান বা প্রাসঙ্গিক বংশধরের উপস্থিতির কারণে স্বামী-স্ত্রীর অংশ পরিবর্তিত হয়। স্বামী সাধারণভাবে অর্ধেক বা এক-চতুর্থাংশ এবং স্ত্রী এক-চতুর্থাংশ বা এক-অষ্টমাংশ পেতে পারেন। তাই সন্তান আছে কি না, সেটি হিসাবের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য।
৫. পিতা-মাতা জীবিত থাকলে কি তারা অবশ্যই অংশ পান?
সাধারণভাবে পিতা ও মাতা জীবিত থাকলে তাঁরা উত্তরাধিকারী হন; তবে তাঁদের প্রাপ্য অংশ অন্য উত্তরাধিকারীদের উপস্থিতির ওপর নির্ভর করে। সন্তান থাকলে পিতা ও মাতা প্রত্যেকে এক-ষষ্ঠাংশ করে নির্ধারিত অংশ পান। সন্তান না থাকা, ভাইবোন থাকা অথবা স্বামী বা স্ত্রী উপস্থিত থাকার কারণে পরবর্তী হিসাবের ধরন পরিবর্তিত হতে পারে। তাই পিতা-মাতার অংশ পুরো পারিবারিক কাঠামো অনুযায়ী নির্ধারণ করতে হয়।
৬. ঋণ পরিশোধের আগে কি উত্তরাধিকার ভাগ করা যায়?
সঠিক পদ্ধতি হলো উত্তরাধিকার বণ্টনের আগে মৃত ব্যক্তির প্রমাণিত ঋণ ও সংশ্লিষ্ট বৈধ দায় নিষ্পত্তি করা। ঋণ বাদ না দিয়ে পুরো সম্পত্তিকে উত্তরাধিকার হিসেবে ভাগ করলে প্রকৃত বণ্টনযোগ্য সম্পদের পরিমাণ ভুল হয়ে যেতে পারে। কোরআনের উত্তরাধিকার আয়াতেও ঋণ ও ওসিয়তের বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে।
৭. কোনো ব্যক্তির ছেলে বা মেয়ে তাঁর আগে মারা গেলে সেই সন্তানের ছেলে-মেয়ে কি অংশ পাবে?
বাংলাদেশে এ ক্ষেত্রে ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশের ৪ ধারা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কোনো ছেলে বা মেয়ে উত্তরাধিকার খোলার আগে মারা গেলে এবং তার সন্তানরা উত্তরাধিকার খোলার সময় জীবিত থাকলে, তারা শাখাভিত্তিকভাবে তাদের পিতা বা মাতা জীবিত থাকলে যে অংশ পেতেন তার সমপরিমাণ অংশ পাওয়ার অধিকারী হয়।
৮. ভাইবোন কি সব অবস্থায় উত্তরাধিকারী হয়?
না। ভাইবোনের অধিকার মৃত ব্যক্তির সন্তান, পিতা এবং অন্যান্য নিকটবর্তী উত্তরাধিকারীর উপস্থিতির ওপর নির্ভর করে। বিশেষ করে কালালা অবস্থায় ভাইবোনের জন্য কোরআনে নির্দিষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। তাই শুধু “ভাই আছে” বা “বোন আছে” জানলেই তাদের অংশ নির্ধারণ করা যায় না।
৯. জীবিত অবস্থায় সন্তানদের সম্পত্তি দিয়ে দিলে সেটি কি ফারায়েজ?
না। ফারায়েজ কার্যকর হয় মালিকের মৃত্যুর পর তার পরিত্যক্ত সম্পত্তিতে। জীবিত অবস্থায় কোনো সম্পদ বৈধভাবে অন্যকে দেওয়া হলে সেটি উত্তরাধিকার বণ্টনের পরিবর্তে হিবা বা অন্য ধরনের সম্পত্তি হস্তান্তরের বিষয় হতে পারে। বড় সম্পদ হস্তান্তরের ক্ষেত্রে যথাযথ নথিপত্র রাখা গুরুত্বপূর্ণ।
১০. স্বয়ংক্রিয় ফারায়েজ হিসাবযন্ত্রের ফল দেখে কি সম্পত্তি ভাগ করা নিরাপদ?
সহজ পরিস্থিতিতে স্বয়ংক্রিয় হিসাবযন্ত্র প্রাথমিক ধারণা দিতে পারে, কিন্তু চূড়ান্ত সম্পত্তি বণ্টনের জন্য শুধু এর ফলের ওপর নির্ভর করা উচিত নয়। পূর্বমৃত সন্তান, একাধিক স্তরের উত্তরাধিকারী, হাজব, আওল, রদ, ওসিয়ত অথবা বাংলাদেশের বিশেষ আইনি বিধান থাকলে হিসাব পরিবর্তিত হতে পারে। তাই চূড়ান্ত বণ্টন বা দলিল করার আগে যোগ্য আলেম এবং প্রয়োজন হলে উত্তরাধিকার বিষয়ে অভিজ্ঞ আইনজীবীর মাধ্যমে হিসাব যাচাই করা উচিত।
উপসংহার
ইসলামী উত্তরাধিকার আইন একটি নির্দিষ্ট ও কাঠামোবদ্ধ ব্যবস্থা। সঠিক ফারায়েজ হিসাবের জন্য প্রথমে নিট পরিত্যক্ত সম্পত্তি নির্ধারণ, ঋণ ও বৈধ ওসিয়ত নিষ্পত্তি, মৃত্যুর সময় জীবিত উত্তরাধিকারীদের পূর্ণ তালিকা তৈরি এবং এরপর প্রত্যেকের শরিয়তসম্মত ও আইনসম্মত অংশ হিসাব করা প্রয়োজন। বিশেষ করে বাংলাদেশে পূর্বমৃত ছেলে বা মেয়ের সন্তানদের বিষয়ে দেশের কার্যকর আইন বিবেচনা করা জরুরি। তাই বাস্তব সম্পত্তি বণ্টনে একটি সাধারণ সূত্রের পরিবর্তে পুরো পারিবারিক কাঠামো যাচাই করাই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি।
গুরুত্বপূর্ণ নোট: এই লেখা সাধারণ শিক্ষামূলক তথ্য দেওয়ার জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে; এটি কোনো নির্দিষ্ট পরিবারের জন্য চূড়ান্ত শরিয়াহি সিদ্ধান্ত বা আইনি পরামর্শ নয়। একজন উত্তরাধিকারীর উপস্থিতি বা অনুপস্থিতি, ঋণ, ওসিয়ত, পূর্বমৃত সন্তান অথবা অন্যান্য পারিবারিক তথ্যের কারণে হিসাব পরিবর্তিত হতে পারে। বাস্তব সম্পত্তি বণ্টন বা দলিল সম্পাদনের আগে যোগ্য আলেম এবং প্রয়োজন অনুযায়ী বাংলাদেশে উত্তরাধিকার বিষয়ে অভিজ্ঞ আইনজীবীর মাধ্যমে তথ্য ও হিসাব যাচাই করা উচিত।

