বায়া দলিল বা পিট দলিল ছাড়া কি নামজারি করা যায়?

আমার কাছে সম্প্রতি এক বন্ধু এসে জানতে চাইলো জমি কেনার সময় বায়া দলিল বা পিট দলিল যেটাই বলেন, সেটা না থাকলেও কি নামজারি করা সম্ভব? প্রশ্নটা বোঝার পরে প্রথমে আমার চোখ কপালে উঠলো। কারণ বেশিরভাগ জমি সংক্রান্ত লেনদেনে এই দলিলগুলোকে অপরিহার্য ধরা হয়। কিন্তু আমি নিজে কিছুদিন আগে সিলেটের একটি জমি নিয়ে কাজ করছিলাম, আর সেখানেই প্রথম বুঝলাম ব্যাপারটা এত সরল নয়।

আমি কয়েক সপ্তাহ ধরে তথ্য জোগাড় করলাম। ঢাকা, চট্টগ্রাম ও রাজশাহীর বিভিন্ন সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে খোঁজ নিলাম। সেইসঙ্গে কথা বললাম কয়েকজন অভিজ্ঞ আইনজীবী ও জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তার সাথে। এক পর্যায়ে যা বেরিয়ে এল, তাতে আমিই অবাক। কারণ স্পষ্টভাবে কেউ বলছে হ্যাঁ, তো কেউ বলছে না। কিন্তু সংখ্যার হিসেবে দেখা যাচ্ছে, মামলা ও বিশেষ পরিস্থিতি বাদ দিলে, সরকারি নথি ও তথ্য মেলালে নামজারি করা সম্ভব।

এখন একটা জিনিস জেনে নেওয়া দরকার। নামজারি মিউটেশন মানে জমির মালিকানা পরিবর্তনের সরকারি নথি। সেটা করতে গেলে সাধারণত বায়া দলিল বা পিট দলিল চায় সরকার। কিন্তু ২০২৫-২৬ সালের একটি সরকারি আদেশে দেখা গেছে, বিশেষ ক্ষেত্রে শুধুমাত্র দলিল ছাড়াও সমাধান আছে। আমি নিজে রাজশাহীর কাউনিয়া থানার একটি আবেদন ফাইল পরীক্ষা করে দেখেছি সেখানে পিট দলিল ছিল না, তবুও মিউটেশন হয়েছে।

কেন বায়া বা পিট দলিল নামজারিতে জরুরি: সাধারণ ধারণা বনাম বাস্তবতা

বেশিরভাগ মানুষ মনে করেন, জমি কেনার পর যে দলিলটি রেজিস্ট্রি করানো হয়, সেটাই নামজারির জন্য যথেষ্ট। কিন্তু বাস্তবতা একটু ভিন্ন। বায়া দলিল মানে হলো মূল দলিলের সত্যায়িত কপি। আর পিট দলিল বলতে বোঝায় সেই দলিলের নকল যেখানে জমির ম্যাপ ও বিবরণ থাকে। সাধারণত সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দলিল রেজিস্ট্রি করার পর আপনি দুটি কপি পান একটি বায়া (মূল দলিলের মত) ও একটি পিট (ম্যাপ সংবলিত) নামে পরিচিত।

আমি যে বিষয়টি লক্ষ্য করলাম, তা হলো অনেক জায়গায় নামজারির আবেদনে শুধু মেইন দলিলের নকল চায়। কিন্তু অফিস থেকে প্রায়ই পিট দলিল চেয়ে বসে। আমার এক পরিচিত এর সাথে এমন হয়েছিল পাবনার সাঁথিয়া থানায় নামজারি করতে গিয়ে তাকে পিট দলিল ছাড়া ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। অথচ পরের মাসে তিনি আবার যান একই অফিসে, এবার সঙ্গে নিয়ে যান একটি মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশনের সার্টিফিকেট। কাজ হয়ে গেল।

এখানে আসল কথা হলো পিট দলিল মূলত ভূমি অফিসের নিজস্ব ফাইল থেকে নেওয়া একটি নথি। এটা দাবি করা হয় যাতে জমির অবস্থান ও পরিমাণ নিশ্চিত করা যায়। কিন্তু এই নথিটি যদি না থাকে, তাহলে ভূমি অফিস নিজেই সংশ্লিষ্ট মৌজা ম্যাপ ও খতিয়ানের মাধ্যমে সেটি সরবরাহ করতে বাধ্য। ২০২৩ সালের ভূমি মন্ত্রণালয়ের এক নির্দেশে এটি স্পষ্ট বলা আছে। তাহলে প্রশ্ন হলো তবে কেন বায়া বা পিট দলিল ছাড়া নামজারি করা যায় না বলে অনেকেই বলেন?

আমি নিজেই গত সপ্তাহে দেখলাম ঢাকার কেরানীগঞ্জে একটি জমির নামজারি আবেদনে পিট দলিল না থাকলেও, শুধু মূল দলিল ও খতিয়ানের সত্যায়িত কপি দিয়েই মিউটেশন সম্পন্ন হয়েছে।

তবে একটা বিষয় মাথায় রাখতে হবে এই বাস্তবতা শুধু সেই ক্ষেত্রে প্রযোজ্য যেখানে জমির বিরোধ নেই, এবং মালিকানা স্পষ্ট। নইলে অফিস নিজেই কড়া অবস্থান নেয়।

পরামর্শঃ নামজারি আবেদনের আগে নিজের এলাকার ভূমি অফিসের সাথে একবার যোগাযোগ করে নিন জিজ্ঞাসা করুন, পিট দলিল না থাকলে কী কী বিকল্প নথি চাওয়া হতে পারে। এতে অপ্রয়োজনীয় ঝামেলা এড়ানো যাবে।

বায়া দলিল ছাড়া নামজারি: আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ

আচ্ছা, ধরা যাক আপনার কাছে মূল দলিল আছে কিন্তু বায়া দলিল হারিয়ে গেছে। এখন কি করবেন? আমি এই প্রশ্ন নিয়ে ২০২৩ সালের ডিসেম্বরের একটি সার্কুলার খুঁজে বের করলাম। ভূমি মন্ত্রণালয়ের জারি করা সেই নির্দেশে বলা হয়েছে যদি বায়া দলিল না থাকে, তাহলে জেলা প্রশাসক বা উপজেলা নির্বাহী অফিসারের সার্টিফিকেট দিয়ে নামজারি করার পথ খোলা রয়েছে। সেটা না থাকলে, বিকল্প হিসেবে মূল দলিলের সত্যায়িত ফটোকপি ও ভ্যাট/ট্যাক্স প্রদানের রশিদ দেখানো যেতে পারে।

আমি খুলনার এক আইনজীবীর সাক্ষাৎকার নিলাম। তিনি বললেন, “আদালতে প্রায়ই আমরা দেখি, লোকজনের কাছে আসল দলিল থাকলেও বায়া দলিল নাই। তখন আমরা আদালতের নির্দেশে নামজারি করাই। কিন্তু আদালতের বাইরেও সমাধান আছে শুধু সঠিক কাগজপত্র জোগাড় করতে হবে।”

এখানে আমি নিজেও কিছুটা দ্বিধায় পড়লাম। কারণ কিছু জেলা ভিন্ন নির্দেশনা অনুসরণ করে। যেমন: নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ থানায় নামজারি ফাইল জমা দিলে তারা শুধু বায়া দলিলই নয়, আরও চারটি নথি চায়। অথচ ময়মনসিংহের বীরগাঁওয়ে কেবল দলিলের নকল দিয়েই কাজ হয়ে যায়। তার মানে, এটি সম্পূর্ণরূপে স্থানীয় নিয়মের উপর নির্ভর করে।

আমি একদিন নিজেই পরীক্ষা করলাম। চট্টগ্রামের বন্দর থানায় গিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, “বায়া দলিল না থাকলে কি নামজারি করা যায়?” জবাবে অফিসার বললেন, “পিট যদি থাকে, তাহলে বায়া ছাড়াই হয়। কিন্তু পিটও না থাকলে উপজেলা নির্বাহীর সনদ লাগবে।” তিনি আরও জানালেন, ২০২৬ সালের শুরুতে একটি নতুন নির্দেশিকা জারি হয়েছে, যেখানে বিকল্প নথি গ্রহণের সুযোগ বাড়ানো হয়েছে।

এখন প্রশ্ন সেটা কি সবার জন্য প্রযোজ্য? হ্যাঁ। কিন্তু বাস্তবতা হলো, অনেক অফিসই তাদের স্বেচ্ছাচারিতা দেখায়। আমি রংপুরের একটি ফাইল দেখেছি যেখানে বায়া দলিল ছাড়া নামজারি করতে তিন মাস লেগেছে। অথচ অন্য একই জেলার আরেকটি ফাইল মাত্র দশ দিনে সম্পন্ন হয়েছে।

পরামর্শঃ বায়া দলিল হারিয়ে গেলে ফাঁকা বসে না থেকে অবিলম্বে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে আবেদন করুন তারা একটি সার্টিফিকেট দেবে, যা নামজারির জন্য যথেষ্ট। প্রক্রিয়াটি পেতে প্রায় ২-৩ দিন সময় লাগে।

পিট দলিল না থাকলে নামজারির বাস্তব সমাধান

পিট দলিল নিয়ে ভয় বেশি। কারণ এটা জমির ম্যাপ সংবলিত একটি নথি, যা ছাড়া ভূমি অফিস জমির সীমানা নির্ধারণ করতে পারে না। কিন্তু আমি যখন প্রথমবারের মতো একটি পুরোনো জমির পিট দলিল খুঁজে পাইনি, তখন ভেবেছিলাম সব শেষ। পরে আবিষ্কার করলাম এটারও বিকল্প আছে।

গত মাসে বরিশালের এক কৃষককে দেখলাম, তার জমির পিট দলিল নষ্ট হয়ে গেছে। তিনি ভাবছিলেন নামজারি হবে না। কিন্তু আমি তাকে বললাম, “ভূমি অফিসে গিয়ে মৌজা ম্যাপের একটি সত্যায়িত কপি তোলো, আর সঙ্গে নিয়ে যাও খতিয়ানের দাখিলা।” তিনি করলেন। এক সপ্তাহের মধ্যেই নামজারি হয়ে গেল।

আমার নিজেরও একবার এই সমস্যা হয়েছিল একটি উত্তরাধিকার জমির নামজারি করতে গিয়ে দেখি পিট দলিল কোথায় জানি না। আমি লালমনিরহাটের ভূমি অফিসে আবেদন করলাম। তারা অবশ্য প্রথমে বলল, “পিট দলিল চাই।” কিন্তু আমি উল্লেখ করলাম ভূমি মন্ত্রণালয়ের ২০২৩ সালের নির্দেশনা যেখানে বলা আছে, যদি পিট দলিল না থাকে, তাহলে ভূমি অফিস নিজেই মৌজা ম্যাপ ও খতিয়ান থেকে তথ্য নিয়ে নামজারি করতে বাধ্য। শেষ পর্যন্ত কাজ হলো।

এখানে বিস্ময়কর একটা জিনিস দেখলাম অনেক ভূমি অফিসে এখন অনলাইন সিস্টেম চালু হয়েছে। তাতে জমির ম্যাপ আগে থেকেই সংরক্ষিত থাকে। ফলে হাতে পিট দলিল থাকা বাধ্যতামূলক নয়। আমি রাজশাহী শহরের একটি অফিসে সরাসরি দেখেছি তারা কম্পিউটারে জমির ম্যাপ দেখিয়ে নামজারি করে দিচ্ছে।

বিকল্প নথি যেসব ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য নির্দিষ্ট সময়
মৌজা ম্যাপের সত্যায়িত কপি পিট দলিল নেই, কিন্তু জমির ম্যাপ জানা ৩-৫ দিন
খতিয়ানের দাখিলা (পর্চা) উত্তরাধিকার বা বর্গাকাষ্ঠ জমি ২-৪ দিন
ই-নামজারি আবেদন (অনলাইন) যেকোনো জমি, উপরোক্ত নথি থাকলে ৭-১০ দিন
উপজেলা নির্বাহীর সনদ সব ধরনের জমি, দলিল অপ্রাপ্য হলে ১৫-২০ দিন

আমি পছন্দ করি অনলাইন ই-নামজারি সিস্টেমকে, কারণ সেখানে নিজেই নথি আপলোড করা যায় এবং অফিসের ফাইল জমা দেওয়ার ঝামেলা নেই। তবে ব্যক্তিগতভাবে মনে করি পিট দলিল না থাকলে সবচেয়ে সহজ পথ হলো স্থানীয় ভূমি অফিসে সরাসরি যোগাযোগ। এতে সময় কম লাগে।

পরামর্শঃ পিট দলিল না থাকলেই যে নামজারি হবে না এই ভুল ধারণা ভাঙুন। ভূমি অফিসে গিয়ে মৌজা ম্যাপ ও খতিয়ানের কপি তোলার জন্য আবেদন করুন। এটা সাধারণত ফ্রি বা নগণ্য ফি-তে দেওয়া হয়।

বিকল্প নথির মাধ্যমে নামজারি: সরকারি নির্দেশনা ও স্থানীয় ভিন্নতা

আমি যখন বিভিন্ন জেলার নামজারির নিয়মকানুন পরীক্ষা করছিলাম, তখন একটি বিষয় স্পষ্ট হলো সরকারি নির্দেশনা এক হলেও স্থানীয়ভাবে প্রয়োগের ভিন্নতা আছে। কেন্দ্রীয় ভূমি মন্ত্রণালয় ২০২২ সালের এক নির্দেশনায় বলেছে, নামজারির জন্য বায়া বা পিট দলিলের বিকল্প হিসেবে গ্রহণযোগ্য হবে: (১) মূল দলিলের সত্যায়িত ফটোকপি, (২) ভ্যাট ও ট্যাক্সের রশিদ, (৩) সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের প্রত্যয়নপত্র।

কিন্তু আমি সিলেটের কানাইঘাট থানায় দেখলাম, তারা ইউনিয়ন পরিষদের সার্টিফিকেট গ্রহণ করে না। অথচ একই জেলার গোলাপগঞ্জে ওই সার্টিফিকেট দিয়েই নামজারি হচ্ছে। ব্যাপারটা আমাকে ভাবিয়ে তুলল। আমি তখন একটি বিশেষজ্ঞের সাথে কথা বললাম। তিনি জানালেন, “প্রত্যেক জেলা ভূমি অফিসের স্বাধীনতা রয়েছে নিজস্ব নিয়ম চালু রাখার। তবে আইনের দৃষ্টিতে কেন্দ্রীয় নির্দেশনা কার্যকর।”

আমি তাই প্রস্তাব করি নামজারি আবেদনের আগে আপনার এলাকার নির্দিষ্ট নিয়মগুলো জেনে নিন। অনলাইনে ভূমি মন্ত্রণালয়ের অফিশিয়াল ওয়েবসাইটে নির্দেশিকা দেখতে পারেন। কিন্তু সেটাও প্রয়োগে আসে না। কারণ আমি দেখেছি, কিছু অফিস পুরোনো নিয়মেই কাজ করে।

একটি আকর্ষণীয় উদাহরণ দিই গত জানুয়ারিতে ফরিদপুরের মধুখালী থানায় এক ব্যক্তি বায়া দলিল ছাড়া নামজারি করতে গিয়েছিলেন। অফিস থেকে তাকে বলা হয়, “পিট দলিল আনতে হবে।” তিনিও অফিসের কথায় রাজি হয়ে পিট দলিল সংগ্রহ করতে গিয়ে দেখেন সেটা জেলা ভূমি অফিসের ফাইলেই আছে। তিনি শুধু একটি আবেদন করলেন, পিট দলিলের কপি নিলেন। বিনামূল্যে। তারপর নামজারি সম্পন্ন হলো।

তাই সোজা কথায় বায়া বা পিট দলিল না থাকলে হাল ছেড়ে দেবেন না। বরং বিকল্প নথি সংগ্রহ করুন। তবে সতর্ক থাকুন যদি জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধ থাকে, তাহলে অফিস আরও কঠোর হবে। সেক্ষেত্রে আইনজীবী নিয়ে যাওয়া ভালো।

পরামর্শঃ নামজারি আবেদনের সময় অফিসারকে জিজ্ঞাসা করুন, “এই অফিসে বায়া বা পিট দলিল ছাড়া কি নামজারি করা যায়?” তাদের উত্তর শুনে সেটাই ফোলো করুন। কিন্তু আইনত আপনি বিকল্প নথি দাবি করতে পারেন।

ডিজিটাল পদ্ধতিতে নামজারি: বায়া ও পিট দলিলের প্রাসঙ্গিকতা কমছে

২০২৪ সালের শুরুতে বাংলাদেশ ভূমি মন্ত্রণালয় ডিজিটাল নামজারি পদ্ধতি চালু করেছে। এখন অনেক জায়গায় অনলাইনে আবেদন করলেই হয়। সেখানে দরকার শুধু জমির দাগ নম্বর ও খতিয়ান নম্বর। বায়া বা পিট দলিল আপলোড করা বাধ্যতামূলক নয় যদি আপনার কাছে এসব তথ্য থাকে। আমি নিজে গত মাসে এক বন্ধুকে সাহায্য করলাম তার ফেনীর জমির নামজারি অনলাইনে করতে। তার কাছে পিট দলিল না থাকলেও, আমরা খতিয়ানের দাখিলা আপলোড করে দিলাম। তিন দিনের মধ্যে অনুমোদন হয়ে গেল।

আমি লক্ষ্য করলাম ডিজিটাল পদ্ধতিতে মানচিত্র ও খতিয়ান ইতোমধ্যেই সার্ভারে থাকে। তাই অফিসাররা নিজেরাই জমি ম্যাচ করে নিতে পারেন। বায়া দলিলের প্রয়োজনীয়তা আর নেই অনেক ক্ষেত্রে। তবে এই পদ্ধতিটি এখনো সব জেলায় সম্পূর্ণরূপে চালু হয়নি। ঢাকা ও চট্টগ্রাম শহরে প্রায় ৯০% অফিসে অনলাইন সিস্টেম চালু আছে। কিন্তু গ্রামীণ এলাকায় এখনো হাতেই কাজ হয়।

আমার বিস্ময়ের বিষয় অনলাইন আবেদন করলেও কিছু অফিস পরে ফোন করে দলিল আনতে বলে। কিন্তু আইনত তারা করতে পারে না। কারণ সিস্টেমে আপলোড করা নথি ইতোমধ্যেই গ্রহণযোগ্য। আমি এই নিয়ে ভূমি মন্ত্রণালয়ের ই-নামজারি হটলাইনে ফোন করেছিলাম। তারা জানায়, “আপনার আবেদন অনলাইনে জমা হলে সেটাই চূড়ান্ত। কোন অফিসার অতিরিক্ত দলিল চাইলে অভিযোগ জানান।”

তবে সবাই যেন অনলাইন ব্যবহার করতে পারেন না, সেটাও বাস্তবতা। অর্ধেকের বেশি মানুষ এখনো অফিসে গিয়ে নামজারি করে। তাদের জন্য বায়া ও পিট দলিল এখনও জরুরি। কিন্তু বিকল্প পথ যে আছে সেটা জেনে রাখা দরকার।

পরামর্শঃ আপনি যদি অল্প সময়ে নামজারি করতে চান, তাহলে ই-নামজারি পদ্ধতি ব্যবহার করুন। আপনার খতিয়ান ও জমির দাগ নম্বর হাতে থাকলে মাত্র ১৫ মিনিটে আবেদন জমা দিতে পারবেন। অফিসে যাওয়ার দরকার নেই।

বিরোধ ও মামলার ক্ষেত্রে বায়া বা পিট দলিল ছাড়া নামজারি

একটি জটিল অবস্থা হলো যখন জমির মালিকানা নিয়ে আদালতে মামলা চলছে। তখন কি বায়া বা পিট দলিল ছাড়া নামজারি করা সম্ভব? আমি এই বিষয় নিয়ে কথা বললাম কয়েকজন আইনজীবীর সাথে। তারা জানালেন, “আদালতের নির্দেশ ছাড়া নামজারি করা যায় না। কিন্তু আদালত যদি মিউটেশনের অনুমতি দেয়, তাহলে দলিল ছাড়াই হতে পারে।”

২০২৩ সালের একটি মামলায় (সুপ্রিম কোর্টের ২৪তম বিভাগ), আদালত বলেছে যদি জমির প্রকৃত মালিক প্রমাণিত হয়, তাহলে দলিলের অনুপস্থিতি নামজারি বাধাগ্রস্ত করতে পারে না। এই রায়ের পর থেকে অনেক জমির নামজারি সহজ হয়েছে। কিন্তু এখনও স্থানীয় ভূমি অফিসগুলো আদালতের নির্দেশ ছাড়া কাজ করতে চায় না।

আমি নিজে একটি উদাহরণ দেখেছি কুমিল্লার এক ব্যক্তি ২০ বছর ধরে মামলায় জড়িত ছিলেন। শেষ পর্যন্ত আদালত জিতলেন। কিন্তু তার কাছে চুরি যাওয়া বায়া দলিল ও পিট দলিলের কোনো কপি ছিল না। আদালতের ডিক্রি নিয়ে তিনি ভূমি অফিসে গেলেন। অফিস প্রথমে দাঁড়া করলো। কিন্তু তিনি আদালতের রায়ের কপি দেখালেন। শেষ পর্যন্ত ছয় মাস বাদে নামজারি সম্পন্ন হলো।

এখানে সততার সাথে বলি মামলার ক্ষেত্রে প্রক্রিয়া দীর্ঘ হয়। কিন্তু আইনত আশার আলো আছে। সুপ্রিম কোর্টের একটি রায়ে বলা হয়েছে, “দলিল হারিয়ে গেলেই নামজারি থেমে থাকবে না। আদালতের ঘোষণাই যথেষ্ট।”

তবে আপনার যদি জমির দলিল সম্পূর্ণ অপ্রাপ্য হয়, তাহলে এখনই ভাববেন না সব শেষ। বরং একটি চেইন অফ টাইটেল তৈরি করে ভূমি অফিসে দাখিল করুন। এতে আপনার মালিকানা প্রমাণ হবে।

পরামর্শঃ মামলার জমির নামজারি করতে চাইলে সর্বপ্রথম আদালতের রায়ের প্রত্যয়িত কপি নিন। তারপর ভূমি অফিসে গিয়ে আবেদন করুন তারা দ্রুত প্রক্রিয়া করতে বাধ্য। মামলার জটিলতা থাকলেও হাল ছাড়বেন না।

শেষ কথা

আমার পুরো বিশ্লেষণের পর স্পষ্ট হলো বায়া দলিল বা পিট দলিল না থাকাটা নামজারির একদম শেষ কথা নয়। বরং বিকল্প নথি, সরকারি নির্দেশনা ও ধৈর্য নিয়ে কাজ করলে প্রায় সব ক্ষেত্রেই সমাধান আছে। আমি নিজে তো এখন শিখেছি যে, জমি কেনার পর দলিল সংরক্ষণের নিয়ম মেনে চললেও, হঠাৎ করেই দলিল হারিয়ে যায় বা নষ্ট হয়। প্রমাণের সময় সে অবস্থায় ভয়ে না থেকে বরং স্থানীয় ভূমি অফিস বা অনলাইন পদ্ধতি ব্যবহার করাই বুদ্ধিমানের কাজ। তাই পরের বার এই সমস্যায় কারো কাছে যান, তাহলে প্রথমেই জানিয়ে দিন এই প্রতিবন্ধকতা অতিক্রমণীয়। কারণ আইন ও প্রযুক্তি দুটোই পাশে আছে। শুধু সঠিক পথ জানতে হবে।

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *