আপনি কি ঢাকা থেকে খুলনা কিংবা খুলনা থেকে ঢাকা আরামদায়ক ও নিরাপদ ভ্রমণের কথা ভাবছেন? তাহলে বাংলাদেশ রেলওয়ের অন্যতম জনপ্রিয় আন্তঃনগর ট্রেন সুন্দরবন এক্সপ্রেস হতে পারে আপনার প্রথম পছন্দ। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের কাছে এই ট্রেনটি অত্যন্ত পরিচিত। বিশেষ করে পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্প চালু হওয়ার পর এই রুটে যাতায়াত এখন অনেক বেশি দ্রুত এবং সহজতর হয়েছে। আজকের এই পোস্টে আমরা সুন্দরবন এক্সপ্রেস ট্রেনের সময়সূচী, টিকেট বুকিং পদ্ধতি এবং ২০২৬ সালের আপডেটেড ভাড়ার তালিকা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।
আরও জানুনঃ পাহাড়িকা এক্সপ্রেস ট্রেনের সময়সূচী ২০২৬ ও ভাড়ার তালিকা
সুন্দরবন এক্সপ্রেস ট্রেনের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
সুন্দরবন এক্সপ্রেস (ট্রেন নম্বর ৭২৫/৭২৬) একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও আধুনিক আন্তঃনগর ট্রেন। এটি মূলত ঢাকার কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন থেকে খুলনার উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায় এবং পুনরায় খুলনা থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হয়। বর্তমানে এই ট্রেনটি পদ্মা সেতু হয়ে চলাচল করে, যার ফলে ঢাকা থেকে খুলনার দূরত্ব এবং সময় উভয়ই উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে। ট্রেনের কোচগুলো আধুনিক এবং যাত্রীদের সুবিধার কথা মাথায় রেখে এখানে বিভিন্ন শ্রেণির আসন ব্যবস্থা রয়েছে। পরিবার নিয়ে ভ্রমণ বা ব্যবসায়িক প্রয়োজনে যাতায়াতের জন্য সুন্দরবন এক্সপ্রেস বর্তমানে পর্যটকদের কাছে প্রথম পছন্দ।
সুন্দরবন এক্সপ্রেস ট্রেনের সময়সূচী ২০২৬
বাংলাদেশ রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন সময় ট্রেনের সময়সূচী পরিবর্তন করে থাকে। ২০২৬ সালের বর্তমান সময় অনুযায়ী সুন্দরবন এক্সপ্রেস সপ্তাহে ৬ দিন চলাচল করে। ঢাকা ও খুলনা উভয় প্রান্ত থেকেই এটি নিয়মিত যাত্রী সেবা প্রদান করে। তবে ভ্রমণের আগে অবশ্যই ট্রেনের সাপ্তাহিক ছুটির দিন এবং ছাড়ার সঠিক সময় জেনে নেওয়া জরুরি। নিচে ঢাকা থেকে খুলনা এবং খুলনা থেকে ঢাকা উভয় পথের সময়সূচী দেওয়া হলো:
ঢাকা টু খুলনা ট্রেনের সময়সূচী (৭২৫)
ঢাকা থেকে খুলনার উদ্দেশ্যে ছেড়ে যাওয়া ট্রেনটির নম্বর হলো ৭২৫। এটি প্রতিদিন সকালে তার যাত্রা শুরু করে। যারা দিনের আলোতে পদ্মা সেতুর সৌন্দর্য উপভোগ করতে চান, তাদের জন্য এই ট্রেনটি সেরা।
- ছাড়ার স্থান: ঢাকা রেলওয়ে স্টেশন (কমলাপুর)।
- ছাড়ার সময়: সকাল ০৮:১৫ মিনিট।
- গন্তব্যে পৌঁছানোর সময়: দুপুর ০৩:৫০ মিনিট।
- ছুটির দিন: সোমবার।
খুলনা টু ঢাকা ট্রেনের সময়সূচী (৭২৬)
খুলনা থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে ছেড়ে আসা ট্রেনটির নম্বর হলো ৭২৬। এটি সাধারণত রাতে যাত্রা শুরু করে এবং খুব ভোরে ঢাকা পৌঁছায়। যারা সারাদিন খুলনায় কাজ শেষ করে রাতে ঢাকায় ফিরতে চান, তাদের জন্য এই সময়সূচী অত্যন্ত কার্যকর।
- ছাড়ার স্থান: খুলনা রেলওয়ে স্টেশন।
- ছাড়ার সময়: রাত ০৯:৪৫ মিনিট।
- গন্তব্যে পৌঁছানোর সময়: ভোর ০৫:১০ মিনিট।
- ছুটির দিন: সোমবার।
সুন্দরবন এক্সপ্রেস ট্রেনের বিরতি স্টেশনসমূহ
সুন্দরবন এক্সপ্রেস ঢাকা থেকে খুলনা যাওয়ার পথে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ স্টেশনে যাত্রা বিরতি দেয়। এই বিরতি স্টেশনগুলোর তালিকা জানা থাকলে আপনি আপনার নিকটস্থ স্টেশন থেকে সহজেই ট্রেনে উঠতে পারবেন। বিশেষ করে কুষ্টিয়া, রাজবাড়ী এবং ফরিদপুরের যাত্রীরা এই ট্রেনের মাধ্যমে খুব সহজে ঢাকায় যাতায়াত করতে পারেন। নিচে বিরতি স্টেশন ও আনুমানিক সময়সূচী দেওয়া হলো:
| স্টেশনের নাম | খুলনা থেকে (৭২৬) ছাড়ার সময় | ঢাকা থেকে (৭২৫) পৌঁছানোর সময় |
| খুলনা | রাত ০৯:৪৫ (যাত্রা শুরু) | দুপুর ০৩:৫০ (গন্তব্য) |
| দৌলতপুর | রাত ০৯:৫৬ | দুপুর ০৩:৩০ |
| নওয়াপাড়া | রাত ১০:২১ | দুপুর ০৩:০৩ |
| যশোর | রাত ১০:৫২ | দুপুর ০২:৩২ |
| মোবারকগঞ্জ | রাত ১১:২৩ | দুপুর ০২:০২ |
| কোটচাঁদপুর | রাত ১১:৩৭ | দুপুর ০১:৪৮ |
| দর্শনা হল্ট | রাত ১২:১০ | দুপুর ০১:২১ |
| চুয়াডাঙ্গা | রাত ১২:৩২ | দুপুর ১২:৫৩ |
| আলমডাঙ্গা | রাত ১২:৫৬ | দুপুর ১২:৩৫ |
| পোড়াদহ | রাত ০১:১৫ | দুপুর ১২:১৫ |
| কুষ্টিয়া কোর্ট | রাত ০১:৩০ | সকাল ১১:৪৭ |
| রাজবাড়ি | রাত ০২:৩৫ | সকাল ১০:৪০ |
| ফরিদপুর | রাত ০৩:১৫ | সকাল ১০:০৫ |
| ভাঙ্গা | রাত ০৪:০০ | সকাল ০৯:২৬ |
| ঢাকা | ভোর ০৫:১০ (গন্তব্য) | সকাল ০৮:১৫ (যাত্রা শুরু) |
সুন্দরবন এক্সপ্রেস ট্রেনের ভাড়ার তালিকা ২০২৬
সুন্দরবন এক্সপ্রেস ট্রেনে বিভিন্ন শ্রেণির আসন রয়েছে। আপনার বাজেট এবং আরামের কথা চিন্তা করে আপনি যেকোনো শ্রেণির টিকেট বেছে নিতে পারেন। বাংলাদেশ রেলওয়ে কর্তৃক নির্ধারিত ২০২৬ সালের ভাড়ার তালিকা নিচে দেওয়া হলো। উল্লেখ্য যে, দূরত্বের ওপর ভিত্তি করে স্টেশনের ভাড়ায় কিছুটা তারতম্য হতে পারে।
| আসন বিভাগ | টিকেটের মূল্য (ভ্যাটসহ আনুমানিক) |
| শোভন চেয়ার (Shovon Chair) | ৬২৫ টাকা |
| স্নিগ্ধা (Snigdha / AC Chair) | ১১৯৬ টাকা |
| এসি সিট (AC Seat / Cabin) | ১৪৩২ টাকা |
| এসি বার্থ (AC Berth) | ২১৫১ টাকা |
সতর্কতা: রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ভাড়ার এই তালিকা যেকোনো সময় পরিবর্তিত হতে পারে। তাই ভ্রমণের আগে সর্বশেষ ভাড়া যাচাই করে নিন।
আরও জানুনঃ রংপুর এক্সপ্রেস ট্রেনের সময়সূচী ভাড়া ও অনলাইন টিকেট ২০২৬
সুন্দরবন এক্সপ্রেস ট্রেনের টিকেট কাটার নিয়ম
বর্তমানে বাংলাদেশ রেলওয়ের টিকেট কাটা অনেক সহজ এবং আধুনিক হয়ে গেছে। যাত্রী হয়রানি কমাতে অনলাইন পদ্ধতিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। আপনি মূলত দুইভাবে টিকেট সংগ্রহ করতে পারেন:
১. অনলাইন টিকেট বুকিং (Online Booking)
বাংলাদেশ রেলওয়ের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট (eticket.railway.gov.bd) অথবা ‘Rail Sheba’ অ্যাপের মাধ্যমে আপনি ঘরে বসেই টিকেট কাটতে পারেন।
- প্রথমে জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) দিয়ে রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন করুন।
- আপনার যাত্রা শুরুর স্টেশন এবং গন্তব্য নির্বাচন করুন।
- পছন্দমতো আসন সিলেক্ট করে অনলাইন পেমেন্ট (বিকাশ, নগদ বা রকেট) সম্পন্ন করুন।
- টিকেট ডাউনলোড করে প্রিন্ট করে নিন অথবা মোবাইলে ই-টিকেট সংরক্ষণ করুন।
২. স্টেশন কাউন্টার থেকে (Counter Booking)
আপনি সরাসরি কমলাপুর অথবা খুলনা রেলওয়ে স্টেশনের কাউন্টারে গিয়ে টিকেট সংগ্রহ করতে পারেন। তবে সুন্দরবন এক্সপ্রেসের টিকেটের চাহিদা অনেক বেশি থাকায় ভ্রমণের অন্তত ৩-৪ দিন আগে টিকেট কাটা বুদ্ধিমানের কাজ। মনে রাখবেন, যাত্রার দিন কাউন্টারে টিকেট পাওয়া বেশ কঠিন হতে পারে।
সুন্দরবন এক্সপ্রেস ট্রেনের কোচ ও সুযোগ-সুবিধা
সুন্দরবন এক্সপ্রেস একটি আধুনিক ব্রডগেজ ট্রেন। এই ট্রেনের বগিগুলো উন্নতমানের এবং বসার আসনগুলো বেশ আরামদায়ক। ট্রেনের প্রধান সুবিধাগুলো হলো:
- পরিচ্ছন্ন টয়লেট: প্রতিটি কোচে পর্যাপ্ত পানির ব্যবস্থাসহ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন টয়লেট রয়েছে।
- খাবার সুবিধা: ট্রেনের নিজস্ব ক্যান্টিন বা ডাইনিং কার রয়েছে যেখানে চা, কফি এবং স্ন্যাকস পাওয়া যায়।
- চার্জিং পয়েন্ট: ট্রেনের এসি কোচগুলোতে মোবাইল বা ল্যাপটপ চার্জ দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে।
- নিরাপত্তা: যাত্রীদের নিরাপত্তায় রেলওয়ে পুলিশ বা নিরাপত্তা বাহিনী ট্রেনে নিয়োজিত থাকে।
যাত্রীদের জন্য বিশেষ টিপস
ঢাকা থেকে খুলনা রুটে সুন্দরবন এক্সপ্রেস ট্রেনের যাত্রা আনন্দদায়ক করতে নিচের টিপসগুলো অনুসরণ করুন:
- সময়ানুবর্তিতা: ট্রেন ছাড়ার অন্তত ৩০-৪০ মিনিট আগে স্টেশনে পৌঁছানোর চেষ্টা করুন।
- মালামাল রক্ষণাবেক্ষণ: ভ্রমণের সময় নিজের মালামাল নিজ দায়িত্বে রাখুন এবং অপরিচিত কারো দেওয়া কিছু খাবেন না।
- পদ্মা সেতুর ভিউ: আপনি যদি ঢাকা থেকে খুলনা যাওয়ার সময় পদ্মা সেতুর দৃশ্য দেখতে চান, তবে জানালার ধারের আসন নেওয়ার চেষ্টা করুন।
- অপেক্ষা তালিকা: অনলাইনে টিকেট না পেলে স্টেশনে গিয়ে ‘স্ট্যান্ডিং টিকেট’ (Standing Ticket) পাওয়া যায় কি না তা যাচাই করতে পারেন।
- রাতের ভ্রমণ: খুলনা থেকে ঢাকা আসার সময় যেহেতু রাত, তাই ভালো ঘুমের জন্য এসি বার্থ বা কেবিন বুক করা বুদ্ধিমানের কাজ হবে।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
সুন্দরবন এক্সপ্রেস ট্রেনটি সপ্তাহে একদিন অর্থাৎ সোমবার চলাচল করে না। সপ্তাহের বাকি ৬ দিন এটি নিয়মিত চলাচল করে।
পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর ঢাকা থেকে সুন্দরবন এক্সপ্রেস ট্রেনে খুলনা পৌঁছাতে প্রায় ৭ ঘণ্টা ১৫ মিনিট থেকে ৭ ঘণ্টা ৩০ মিনিট সময় লাগে।
হ্যাঁ, বাংলাদেশ রেলওয়ের ওয়েবসাইট এবং মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে খুব সহজেই টিকেট বুক করা যায়। সাধারণত যাত্রার ১০ দিন আগে থেকে টিকেট উন্মুক্ত করা হয়।
হ্যাঁ, এই ট্রেনে স্নিগ্ধা (এসি চেয়ার), এসি সিট এবং এসি বার্থের (শোয়ার ব্যবস্থা) চমৎকার সুবিধা রয়েছে।
ঢাকা থেকে খুলনাগামী সুন্দরবন এক্সপ্রেস ট্রেনের নম্বর ৭২৫ এবং খুলনা থেকে ঢাকাগামী ট্রেনের নম্বর ৭২৬।
শেষ কথা
সুন্দরবন এক্সপ্রেস ট্রেনের সময়সূচী ও ভাড়ার তালিকা জানা থাকলে আপনার যাত্রা যেমন পরিকল্পনা মাফিক হবে, তেমনি ভোগান্তিও কমবে। ২০২৬ সালে এসে বাংলাদেশের রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা অনেক উন্নত হয়েছে, যার অন্যতম উদাহরণ হলো এই সুন্দরবন এক্সপ্রেস। ঢাকা ও খুলনার মধ্যবর্তী সংযোগের ক্ষেত্রে এই ট্রেনটি যাতায়াতের জন্য এক নির্ভরযোগ্য এবং সাশ্রয়ী মাধ্যম।
আমরা চেষ্টা করেছি আপনাদের সঠিক এবং নির্ভুল তথ্য প্রদান করতে। তবে রেলওয়ের সময়সূচী বা ভাড়া যেকোনো সময় পরিবর্তন হতে পারে। তাই ভ্রমণের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে নিকটস্থ স্টেশন বা অনলাইন অ্যাপ থেকে তথ্যগুলো পুনরায় যাচাই করে নেওয়ার অনুরোধ রইল। আশা করি, আমাদের আজকের এই পোস্টটি আপনার পরবর্তী ভ্রমণের জন্য সহায়ক হবে। আপনার যাত্রা শুভ ও নিরাপদ হোক।
