বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ (এনটিআরসিএ) ১৩তম ও ১৪তম নিবন্ধনধারী শিক্ষক প্রার্থীদের নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে। ২০২৬ সালের ২ এপ্রিল এই তথ্য নিশ্চিত হওয়ার পর পুরো শিক্ষক নিয়োগপ্রার্থী মহলে তৈরি হয়েছে নতুন আলোচনা। বিশেষ করে যাদের বয়স ৩৫ বছর ছাড়িয়েছে এবং নিবন্ধন সনদের মেয়াদ তিন বছর অতিক্রম করেছে, তাদের জন্যই এই প্রস্তাবের প্রভাব সবচেয়ে বেশি।
কেন এই প্রস্তাব? কী বলছে এনটিআরসিএ?
শিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনের নির্দেশনায় গত মঙ্গলবার এনটিআরসিএ সংশ্লিষ্ট সারসংক্ষেপ মন্ত্রীর দপ্তরে জমা দেয়। প্রস্তাবনায় স্পষ্ট উল্লেখ করা হয়েছে, সিভিল রিভিউ পিটিশন নং-১৯৫/২০২০ মামলার রায় অনুযায়ী, প্রার্থীদের প্রত্যয়নপত্রের মেয়াদ ইস্যুর তারিখ থেকে মাত্র তিন বছর পর্যন্ত বহাল থাকে। আর বয়সের ক্ষেত্রে নিয়োগ সুপারিশের জন্য প্রার্থীকে সর্বোচ্চ ৩৫ বছরের মধ্যে থাকতে হবে।
আইনি জটিলতা ও আপিল বিভাগের রায়
মেয়াদ ও বয়সের শর্ত
আপিল বিভাগের রায় অনুযায়ী, প্রার্থীর ক্ষেত্রে দুইটি বিষয়ের যেটি আগে ঘটবে— সেটিই কার্যকর হবে। অর্থাৎ কারও নিবন্ধন সনদের তিন বছর পূর্ণ হয়ে গেলেও বয়স ৩৫-এর নিচে থাকলে তিনি অযোগ্য বলে গণ্য হবেন। আবার বয়স ৩৫ পূর্ণ হলেও সনদের মেয়াদ তিন বছর শেষ না হলে তবু তিনি আবেদনের সুযোগ পাবেন না। এনটিআরসিএ স্পষ্ট জানিয়েছে, বিদ্যমান রায়ের বাইরে কিছু করার আইনগত সুযোগ তাদের কার্যালয়ের নেই।
২০১৫ সালের সংশোধিত পরীক্ষা বিধি কী বলছে?
২০১৫ সালে এনটিআরসিএর সংশোধিত পরীক্ষা বিধি অনুযায়ী প্রত্যয়নপত্রের মেয়াধ নির্ধারিত আছে তিন বছর। আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আইন ও বিচার বিভাগ এবং সলিসিটর অনুবিভাগের মতামত নিয়েই এনটিআরসিএ তাদের কার্যক্রম চালাচ্ছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, এই কঠোর শর্তের কারণে কত প্রার্থী বাদ পড়বেন?
চলমান মামলা ও আদালতের নির্দেশনা
বর্তমানে ১৩তম ও ১৪তম ব্যাচের কনটেম্পট পিটিশন নং ১৪/২০২৪, ২৩/২০২৪, ৩০/২০২৪, ৩২/২০২৪, ০৯/২০২৪, ৪০/২০২৪, ৫৭/২০২৪ ও ৩৬৭/২০২৪ মামলা চলমান রয়েছে। এনটিআরসিএ জানিয়েছে, এসব মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি প্রয়োজন। পাশাপাশি এমপিও নীতিমালায় সরকার কর্তৃক নির্ধারিত বয়স ৩৫ বছর ও সনদের মেয়াদ তিন বছর নিয়ে আরও স্পষ্ট আইনি নির্দেশনা চেয়েছে সংস্থাটি।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় কী করবে?
এনটিআরসিএ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কাছে সুস্পষ্ট নির্দেশনা চেয়েছে। তাদের প্রস্তাব অনুযায়ী, এমপিও নীতিমালায় বয়স ও সনদের মেয়াদ সংশোধন করা জরুরি। অন্যথায় হাজারো নিবন্ধনধারী শিক্ষক নিয়োগের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবেন। বিশেষ করে ২০১৫ সালের আগে যারা নিবন্ধন পেয়েছিলেন, তাদের অনেকেই বর্তমানে ৩৫ বছর পেরিয়ে গেছেন।
কী পরামর্শ দিচ্ছেন আইনজীবীরা?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যাদের বয়স ৩৫ বছর অতিক্রম করেছে এবং সনদের মেয়াদ তিন বছরের বেশি, তারা সরাসরি নিয়োগের সুযোগ পাবেন না, যদি না নীতিমালায় পরিবর্তন আসে। তবে যাদের মামলা চলমান আছে, তাদের জন্য চূড়ান্ত রায় পর্যন্ত অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় নেই। ইতোমধ্যে অনেক প্রার্থী উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন।
কী পরিবর্তন আসতে পারে?
-
বয়সসীমা শিথিলকরণ: প্রস্তাবে উল্লেখ আছে, শিক্ষা মন্ত্রণালয় চাইলে এমপিও নীতিমালা সংশোধন করে বয়সসীমা বাড়াতে পারে।
-
সনদের মেয়াদ বাড়ানো: বর্তমানে তিন বছর মেয়াদ অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত বলে মনে করছেন প্রার্থীরা। পাঁচ বছর বা তার বেশি করার দাবি উঠেছে।
-
মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি: চলমান কনটেম্পট পিটিশন ও রিভিউ মামলার দ্রুত শুনানি জরুরি।
শেষ কথা
সার্বিক বিবেচনায়, ১৩তম ও ১৪তম নিবন্ধনধারী শিক্ষক প্রার্থীরা আইনি জটিলতা ও নীতিগত শর্তের মাঝে আটকে পড়েছেন। এনটিআরসিএ প্রস্তাব দিলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখন শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও আদালতের হাতে। প্রার্থীদের আশা, দ্রুত একটি সমন্বিত সিদ্ধান্ত আসবে, যাতে মেধা ও অভিজ্ঞতা মূল্যায়ন করে ন্যায্য নিয়োগ নিশ্চিত হয়। আপাতত সব দৃষ্টি মন্ত্রণালয়ের পরবর্তী পদক্ষেপ ও আদালতের রায়ের দিকে।
